খোলাফায়ে রাশেদীন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
খোলাফায়ে রাশেদীন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর একটি ঘটনা এবং আমাদের জন্যে শিক্ষা

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
 

আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস্সালাতু ওয়স্সালামু আলা নাবিয়্যিনা মুহম্মাদ ﷺ।

আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর এই ঘটনাটি মোটামুটি আমরা সবাই জানি, কিন্তু ঘটনাটির মাঝে একটি গুরত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যা আমাদের অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে। ইনশাল্লাহ, সেই বিষয়েই এখানে আলোকপাত করব।
আহমদ ইবনে হাম্বল রহিমাহুল্লাহ কর্তৃক বর্ণিত, জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রা) এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
রাসূল ﷺ মিরাজ থেকে ফিরে এসেছেন। সকালবেলা তিনি যখন মক্কার কুরাইশদের মিরাজের ঘটনাটি বললেন তখন কুফ্ফার সম্প্রদায় হাসি-তামাশায় লিপ্ত হয়েছিল। মক্কার এই কুরাইশ সম্প্রদায়ের কুফ্ফারগণ ছিলেন অনেকটা বস্তুবাদি। যা দেখা, যায় ধরা যায়, ছোয়া যায় শুধু তাই তারা আমলে নিত। রাসূল ﷺ এর মিরাজের ঘটনাটিকে তারা একটা হাতিয়ার হিসেবে ধরে নিল আর এর মাধ্যমে মিরাজের ঘটনাটিকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইল। কুফ্ফার সম্প্রদায়ের কিছু লোক আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর নিকট গেলেন। তিনি বাণিজ্য থেকে কিছুক্ষণ আগে ফিরে এসেছেন, তাই তখনও রাসূল ﷺ এর সাথে দেখা করতে পারেননি। কুফ্ফার সম্প্রদায় তাকে বলল, শুনেছ কি তোমার সঙ্গী কি সব বলা শুরু করেছে? সে বলছে, সে নাকি এক রাতের মধ্যে মক্কা থেকে বাইতুল মাকদাস(জেরুজালেম) যেয়ে আবার মক্কায় ফিরে এসেছে।
আবু বকর (রা) বললেন, এই কথাগুলো কি তিনি বলেছেন?
তারা জবাব দিল, হ্যাঁ।
এরপর আবু বকর (রা) বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, যদি তিনি সত্যিই বলে থাকেন, তাহলে তিনি সত্য বলেছেন।
কুফফার সম্প্রদায়ের বিস্ময়ে চোখ কপালে উঠে গেল। তারা বলল, তুমি বিশ্বাস কর সে বৃহত্তর সিরিয়ায় যেয়ে আবার এক রাতের মধ্যে ফিরে এসেছে!
আবু বকর (রা) বললেন, আমি তাকে বিশ্বাস করি বরং এর চেয়েও বেশী বিশ্বাস করি ঐসব বিষয়ে যেগুলো তাঁর নিকট ওহী হিসেবে এসেছে।
মোটামুটি এই ঘটনাটুকু আমরা সবাই জানি, কোন বইতে পড়ে কিংবা কারো নিকট থেকে এই ঘটনা শুনে আমরা পুলকিত হই কিন্তু এই ঘটনার মাঝে গুরুত্বপূর্ণ একটি হিকমা রয়েছে যা আমাদের অনেকেরই নজর এড়িয়ে গেছে।
কুফ্ফার সম্প্রদায় যখন আবু বকর (রা) কে রাসূল ﷺ এর মিরাজ সম্পর্কিত কথাটি বলল তখন, আবু বকর (রা) এর যদি দূর্বল ঈমান থাকত তাহলে তিনি বলতেন, না এই ঘটনাটি সত্য নয় অথবা, আবু বকর (রা) যদি এমন হতেন যাকে খুব সহজেই কথার চাতুরী দ্বারা অভিভূত করা যায় তাহলে তিনি বলতেন ঘটনাটি সত্য। আবু বকর (রা) চমৎকারভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, মাশাল্লাহ। তিনি ঘটনাটি শুনেছেন কুফ্ফারদের নিকট থেকে আর তাই আবু বকর (রা) বললেন, যদি তিনি সত্যিই বলে থাকেন, তাহলে তিনি সত্য বলেছেন।
এর দুইটি অংশ রয়েছে, প্রথমত, ‘যদি তিনি সত্যিই বলে থাকেন’ – হাদীস বিশেষজ্ঞগণ এই পদ্ধতীতে কাজ করেন, অর্থাৎ যদি উৎস সত্যিই রাসূল ﷺ এর নিকট থেকে আসে- দ্বিতীয়ত, তাহলে তা সত্য। সেটা হচ্ছে ওহী, আল্লাহর নিকট থেকে রাসূল ﷺ এর উপর নাযিলকৃত। অর্থাৎ সহীহ হাদীস পাওয়া গেলে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা, সেই অনুযায়ী কর্তব্য পালন করা ঈমানী দায়িত্ব, কারণ সেটা ওহী। এমন কথা বলা যাবে না যে, এটা তো আমার যুক্তিতে টিকল না বা আমার বাপ-দাদাদের কখনও এমন কিছু বলতে বা করতে দেখিনি কিংবা আমার মাযহাবে এমনটি সমর্থন করে না’।
আবু বকর সিদ্দীক (রা) এর এই ঘটনা থেকে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এটাই, রাসূল ﷺ এর কথা সহীহভাবে আমাদের নিকট পৌছালে বিনা বাক্য ব্যয়ে তা মেনে নিতে হবে, তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কর্ম পালন করতে হবে। সেটা আমার নিকট যুক্তিতে টিকুক আর না টিকুক, আমার চারপাশে লোকজন সেটা মানুক আর না মানুক আমাকে রাসূল ﷺ এর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করতেই হবে এবং তার যথাসাধ্য অনুসরণ করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের রাসূল ﷺ এর সাহাবীদের মতো করে দ্বীন ইসলামকে বুঝার তৌফিক দান করুন এবং সেই অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

একটি মোমবাতির কাহিনী

মোমের আলোয় কাজ করছিলেন খলিফা উমর রাযিআল্লাহু আনহু । এমন সময় সেখানে আসলেন তার দুই আত্মীয় । খলিফা তাড়াতাড়ি ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটি নিভিয়ে দিলেন । অন্য আরেকটি মোমবাতি ধরিয়ে অতিথিদের বসতে দিয়ে তাদের খোজখবর নিলেন ।

কৌতুহল চাপতে না পেরে একজন জানতে চাইলেন , আমাদের দেখে কেন আপনি আগের মোমবাতি নেভালেন আর নতুন একটি জ্বালালেন ? খলিফা জবাব দিলেন : আগের মোমবাতি ছিল রাষ্ট্রের সম্পত্তি থেকে কেনা । তোমরা যেহেতু আমার আত্মীয় , তাই তোমাদের সাথে আমার ব্যক্তিগত অনেক আলাপ হবে । আমার নিজের কাজে জনগণের আমানত থেকে আমি কিছু খরচ করতে পারি না । তাহলে আল্লাহর দরবারে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে । তাই নিজের টাকায় কেনা মোমবাতিটি তোমাদের দেখে জ্বালালাম ।
এই জবাবে আত্মীয়রা হতভম্ব হলেন । তারা এসেছিলেন আত্মীয়তার খাতিরে বিশেষ কোন সুবিধা পাওয়া যায় কি না , সেই অনুরোধ করতে । কিন্ত্ত সামান্য মোমবাতি নিয়ে খলিফার এত বিবেচনা ও সতর্কতা দেখে নিজেদের প্রস্তাব জানাতে তারা আর সাহসই করলেন না ।

আরেকবার খলিফার কাছে এক লোক অবৈধ সুবিধা চায় । খলিফার সামনে রাখা কিছু কাঠে তখন আগুন জ্বলছিল। খলিফা বললেন , ঠিক আছে । তুমি এই আগুনের ভিতর তোমার হাত কিছু সময়ের জন্য রাখো ; তারপর তোমার অনুরোধ আমি বিবেচনা করবো । লোকটি ভয় পেয়ে বললো , হে খলিফা ; এই আগুনে হাত ঢুকালে আমার হাত তো জ্বলে যাবে । খলিফা বললেন , তুমি দুনিয়ার এই সামান্য আগুনকে ভয় পাচ্ছ অথচ আমাকে তুমি দোযখের অনন্ত আগুনের ভিতরে নিয়ে যেতে চাও ? তদবিরকারী নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে যায়।

খলীফার মহানুভবতা



ইসলামী শাসনকালের লৌহমানব হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খিলাফতকাল। তখন ইরানের একটি প্রদেশের শাসক ছিলেন হরমুজান। হরমুজান একদিকে যেমন অত্যাচারী অপরদিকে ঘোর ইসলাম বিরোধী। মুসলমানদের সাথে তার লড়াই হতো প্রায়ই। লড়াইয়ে পরাজিত হলেই তিনি বিভিন্ন শর্তে সন্ধী করতেন এবং নিজের রাজ্যে ফিরে যেতেন। কিন্তু এরপর আবার যখনই সুযোগ পেতেন মুসলমানদের ক্ষতি সাধন করেতেন।
শেষে খলীফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আদেশ দিলেন, হরমুজানকে জীবন্ত ধরে এনে তাঁর মজলিসে হাজির করতে। ইতিমধ্যে এক যুদ্ধে হরমুজান মুসলমানদের হাতে বন্দী হলেন। খলীফার হুকুম মোতাবেক তাকে বেঁধে খলীফার দরবারে হাজির করা হলো।

খলীফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে লক্ষ্য করে বললেন,


“আপনি আমাদের সাথে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, আর আপনার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই আমাদের বারবার যুদ্ধ বিগ্রহে জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। ফলে অসংখ্য মুসলিম সৈন্যকে অযথা প্রাণ দিতে হচ্ছে। তাদের অর্থ সম্পদ নষ্ট হয়েছে। অনেকে ঘরবাড়ি আপনি ধ্বংস করেছেন। নিরীহ অনেক লোকের উপর আপনি অন্যায়ভাবে অত্যাচার চালিয়েছেন। আপনাকে আর সুযোগ দেয়া যায় না। আপনার একমাত্র শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পূর্বে আপনার কোন কথা থাকলে বলতে পারেন।” হরমুজান ছিলেন খুব সূক্ষবুদ্ধির লোক। সুযোগ পেয়ে তিনি একটি ফন্দী আঁটলেন। তিনি বললেন,

“মহানুভব খলীফাতুল মুসলিমিন, আমার বড়ই পিপাসা পেয়েছে, দয়া করে আমাকে একটু পানি পান করতে দিন।”
খলীফার নির্দেশে তাকে একটি পাত্রে পানি পান করতে দেয়া হল। সুচতুর হরমুজান পানির পাত্র হাতে নিয়ে তা পান না করে ভীতু ভীতু ভাব দেখাতে লাগলেন এবং ডানে বামে তাকাতে লাগলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, “কি হলো, আপনি পানি পান করছেন না কেন?” তিনি জবাব দিলেন,” আমিরুল মুমিনিন, আমার ভয় হচ্ছে যে, পানিটুকু পান করার আগেই আমাকে হত্যা করে ফেলা হয় কিনা?”
খলীফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আপনি নির্ভয়ে পান করুন। হাতের পানি পান করার পূর্বে আপনাকে হত্যা করা হবে না। এ ব্যাপারে আপনাকে নিশ্চয়তা দিলাম।”
হরমুজান আমীরুল মুমিনিনের এ কথা শেষ হবার সাথে সাথেই হাতের পানির পাত্রটি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন, আর বললেন,


“মহামান্য খলীফা, আপনি নিজেই বলেছেন, হাতের পানিটুকু পান করার আগে আমাকে হত্যা করবেন না। আমি পানি ফেলে দিয়েছি, সে পানি আর পান করবো না। ওয়াদা অনুযায়ী আপনিও আমাকে আর হত্যা করতে পারবেন না।”
হরমুজানের এ চাতুরীপূর্ণ কথা শুনে মুসলিম সৈনিকেরা খুব রেগে গিয়ে বললেন, ” আমীরুল মুমিনিন, আপনি অনুমতি দিন আমরা এখনই তার চাতুরীর সাধ মিটিয়ে দেই।তাকে এখনই হত্যা করে ফেলবো।”


কিন্তু খলীফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু সকলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “না তা হতে পারে না। মুসলমানের কথার মূল্য অনেক। সুতরাং যে কথা আমি বলে ফেলেছি, যেকোন মূল্যে আমি তা রক্ষা করবই ইনশা’আল্লাহ। যেহেতু আমি তাকে বলেছি, তার হাতের পানিটুকু পান করার পূর্বে তাকে আমি হত্যা করব না, আর সে যখন পানি পান করেনি সুতরাং, বন্দী হরমুজানকে হত্যা করা চলবে না।”হরমুজানকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, “যান। আপনি মুক্ত। আমার কথার খেলাফ আমি করবো না।”
কথার কি অদ্ভুত দাম ! ওয়াদা পালনের কি অপূর্ব নযীর। হরমুজান কল্পনাও করতে পারেননি যে, তিনি এত সহজে মুক্তি লাভ করতে পারবেন। খলীফা হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মহানুভবতা দেখে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হলেন। তিনি ভাবলেন, এই যদি হয় ইসলামের আদর্শ তবে এর থেকে দূরে থাকা হবে আমার জন্যে চরম দুর্ভাগ্যজনক। ইসলামের অতুলনীয় আদর্শে মুগ্ধ হয়ে তিনি সাথে সাথে ইসলাম গ্রহণ করে নিলেন।
এমনিভাবেই যুগে যুগে ইসলামের অতুলনীয় আদর্শে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

মূল: খন্দকার মুশতাক আহমদ