শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০১৭

মহান আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা ও তাঁকে ভালোবাসা-২

[রিয়াদুস সালেহীন, দ্বিতীয় খণ্ড, হাদীস নং ৪৫২-৪৫৬]
৪৫২ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর একদা হযরত আবু বকর(রা) হযরত উমর (রা) কে বললেন, চলো, আমরা উম্মে আয়মানকে দেখে আসি, যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখতে যেতেন। অতঃপর তাঁরা যখন তাঁর কাছে পৌছলেন, তিনি কেঁদে ফেললেন।তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে, মহান আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত মঙ্গলময় পরিবেশে ও কুশলেই আছেন? তিনি বললেন, আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আসমান থেকে ওহী আসা যে বন্ধ হয়ে গেলো! এ কথায় তাদের অন্তর প্রভাবিত হলো এবং তাঁর সাথে তাঁরাও কাঁদতে শুরু করে দিলেন। (মুসলিম)
৪৫৩ হযরত ইবন উমার(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথাজনিত রোগ যখন তীব্র আকার ধারণ করলো, সে সময় একদা তাঁকে নামাযে আহ্বান করা হলে তিনি বললেন; আবু বকরকে আদেশ করো, সে যেন সাহাবাদের সাথে নামায পড়ে(অর্থাৎ ইমাম হয়ে নামায পড়ায়) হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তো অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, যখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করবেন, তখন ক্রন্দন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। অতঃপর আবার তিনি বললেন; তাকে আদেশ কর সে যেন নামায পড়ায়।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (আয়েশা) বলেন, আমি বললাম, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন আপনার জায়গায় দাঁড়াবেন কান্নার কারণে মুসল্লিদের (কুরআন) শুনতে পারবেন না। (বুখারি ও মুসলিম)
৪৫৪ হযরত ইবরাহীম ইবন আবদুর রহমন ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। একদা আবদুর রহমান ইবন আউফের সামনে খাবার পেশ করা হলো, তখন তিনি ছিলেন রোযাদার। তিনি বললেন, মুস’আব ইবন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়ে গেছেন। আর তিনি আমার চাইতে উত্তম লোক ছিলেন। তাঁকে কাফন দেয়ার মতো কাপড়ের ব্যবস্থাই ছিল না। তবে একটি চাদর ছিল, এ দ্বারা তাঁর মাথা ঢাকতে চাইলে তাঁর পা দুটি অনাবৃত হয়ে যেত, আর পা ঢাকতে চাইলে মাথা অনাবৃত হয়ে যেতো। অতঃপর আমাদের পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ দেয়া হলো। ভয় হচ্ছে, আমাদের সৎকাজের বিনিময়ে ইহকালের কখনো দস্তরখানে (খানার স্থানে) বসে খাদ্য গ্রহণ করেননি, আর কখনো চাপাতি রুটিও খাননি। (বুখারী)
৪৫৫ হযরত আবু উমাম সুদাই ইবন আজলান আল-বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহর কাছে দুটি বিন্দু (ফোঁটা) দুটি নিদর্শনের চাইতে প্রিয় বস্তু আর কিছু নেই। তার একটি হলো আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুবিন্দু এবং অপরটি হলো; আল্লাহর পথে প্রবাহিত রক্তবিন্দু। আর নিদর্শন দুটি হলো, আল্লাহর পথে জিহাদ করা এবং আল্লাহর ফরযসমূহের মধ্য থেকে কোন ফরয আদায় করা। (তিরমিযী)
৪৫৬ হযরত ইরবাদ ইবন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে এমন এক উপদেশপূর্ণ খুতবা দেন যাতে আমাদের অন্তর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। (আবু দাউদ ও তিরমিযি)

মহান আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা ও তাঁকে ভালোবাসা -১

রিয়াদুস সালেহীন, দ্বিতীয় খন্ড






মহান আল্লাহ তায়ালার বাণী ; “আর যারা কাঁদতে কাঁদতে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, আর (কুরআন) তাদের ভয় ভীতি ও নম্রতাকে আরো বৃদ্ধি করে দেয়”। (সূরা বনী ইসরাঈলঃ১০৯)
“তবে কি তোমরা এই কথায় বিস্মিত হচ্ছো আর হাসছো কিন্তু কাঁদছো না” (সূরা নাজমঃ ৫৯-৬০)
৪৪৬। হযরত ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেনঃ আমার সামনে কুরআন তিলাওয়াত করো। আমি বললাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! আমি আপনার সামনে পড়বো, অথচ আপনার কাছেই তা নাযিল হয়েছে? তিনি বললেন ; আমি অপরের তিলাওয়াত শুনতে ভালোবাসি। সুতরাং আমি তার সামনে সূরা নিসা পড়ে শুনালাম। পড়ার সময় যখন আমি এই আয়াতে এসেছি “তখন কি অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেকে উম্মত থেকে একজন করে সাক্ষী উপস্থাপিত করবো এবং আপনাকে তাদের উপর সাক্ষীরুপে উপস্থিত করবো?”(সুরা নিসাঃ ৪১)। তিনি বললেন, বেশ যথেষ্ট হয়েছে, থামো। এ সময় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তাঁর মুবারক দু’চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। [বুখারি মুসলিম]
৪৪৭। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক (নসীহতপূর্ণ) ভাষণ দিলেন, যে ধরণের ভাষণ আমি আর কখনো শুনিনি। তিনি বলেন ; আমি যা জানি, তোমরা যদি তা জানতে পারতে,তাহলে হাসতে খুবই কম; কিন্তু কাঁদতে খুবই বেশী। তিনি (রাবী) বলেন, একথা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবাগণ কাপড়ে মুখ ঢাকলেন এবং ডুকরে কাঁদতে লাগলেন।[ বুখারি ও মুসলিম]
৪৪৮। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করেছে সে দোযখে প্রবেশ করবে না যে পর্যন্ত দুধ স্তনে ফিরে না আসে। আর আল্লাহর পথে জিহাদের ধুলোবালি এবং দোযখের ধোঁয়া কখনো একত্রিত হবে না। (বুখারি ও মুসলিম )
৪৪৯। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :৭ শ্রেণীর লোকদের মহান আল্লাহ সেদিন তাঁর সুশীতল ছায়াতলে স্থান দিবেন, যেদিন তাঁর ছাড়া অন্য কোন ছায়াই থাকবে না। তাঁরা হলেন
• ন্যায়বিচারক শাসক বা নেতা
• মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল যুবক
• মসজিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি
• যে দুজন লোক একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পর বন্ধুত্ব করে এবং এ জন্যেই আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
• এরুপ ব্যক্তি যাকে কোনো অভিজাত পরিবারের সুন্দরী নারী খারাপ কাজে আহবান করেছে, কিন্তু সে বলে দিল, আমি আল্লাহকে ভয় করি
• যে ব্যক্তি এতো গোপনভাবে দান-খয়রাত করে যে, তার ডান হাত কি দান করলো, বাঁ হাতেও তা জানতে পারলো না
• এরুপ ব্যক্তি যে নির্জনে আল্লাহর যিকির করে এবং দু’চোখের পানি ফেলে (কাঁদে)। [বুখারি ও মুসলিম]

৪৫০। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন শিখরীর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে দেখি তিনি নামায পড়ছেন এবং আল্লাহর ভয়ে কাঁদার দরুণ তাঁর পেট থেকে হাঁড়ির মতো আওয়াজ বেরুচ্ছে। [আবু দাউদ]
৪৫১। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম উবাই ইবন কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু কে বললেন; মহামহিম আল্লাহ আমাকে তোমার সামনে সূরা (বাইয়্যিনাহ) পড়তে আদেশ করেছেন। তিনি (উবাই) জিজ্ঞেস করলেন, তিনি (আল্লাহ) কি আমার নাম উল্লেখ করেছেন? তিনি (নবী) বললেন; হ্যাঁ। অতঃপর উবাই(রা) কেঁদে উঠলেন। [বুখারি ও মুসলিম ]

ইলম অর্জনে শিশুর অধিকার

লেখকঃ মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
ইলম অর্জন, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভ, ইহপরকালীন কল্যাণের পথ পথান্তর বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা অর্জন শিশুর একটি মৌলিক অধিকার। এ অধিকার প্রদানে, এ বিষয়ে শিশুর যথাযথ পরিচর্যায় মহানবী সা. স্থাপন করেছেন সর্বোচ্চ আদর্শ। আমাদের সালাফে সালেহীনগণও এক্ষেত্রে রেখেছেন উজ্জ্বল উদাহরণ।
মহানবী সা. জ্ঞান অন্বেষণ প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ বলে ঘোষণা করেছেন। [ দ্রঃ: আল মাকাসিদুল হাসানা: ৬৬০] জ্ঞান অন্বেষণ সর্বোত্তম ইবাদত। আর এ ইবাদত চর্চার জীবনব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া শুভ শুরু শিশুকাল থেকেই শুরু হয়, শুরু হওয়া আবশ্যক; কেননা শিশুকালে লব্ধ জ্ঞান পাথরে খচিত রেখার মতোই, যা কখনো মুছে যাবার নয়।

আবু হুরায়রা (রাযি:) হতে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:’যে ব্যক্তি শিশুকালে কুরআন শিখল, কুরআন তার রক্তমাংসের সাথে মিশে গেল, আর যে ব্যক্তি বৃদ্ধ বয়সে কুরআন শিখল, আর কুরাআন তার কাছ থেকে ছুটে যাওয়া সত্ত্বেও সে লেগে রইল, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ ছোয়াব। [ দায়লামি, হাকেম]
ইবনে আব্বাস (রাযি:) বলেন :’যে ব্যক্তি বয়ঃপ্রাপ্তির পূর্বেই কুরআন শিখল তাকে প্রজ্ঞা দিয়ে ভূষিত করা হল। ‘
খতিব আল বাগদাদি ইলম শেখানোর ব্যাপারে সালাফে সালেহীনদের উদ্যোগ-আগ্রহের একটি দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন যার কিছু অংশ এখানে তুলে দেওয়া হল:

হাসান বলেছেন:’ আমাদের হাতে আপনাদের শিশুদের তুলে দিন, কেননা তারা হল শূন্য হৃদয়, তারা যা শোনে তা সংরক্ষণ করে রাখতে অধিক সক্ষম। সাঈদ ইবনে রাহমা আল আসবাহি বলেন: আমি রাতে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের মজলিসে সবার আগে যেতাম, আমার সঙ্গী-সাথী ছিল যারা কখনো আমার পূর্বে যেতে পারত না। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বৃদ্ধদের সঙ্গে নিয়ে প্রবেশ করতেন। তারা একবার আব্দুল্লাহ ইবুল মুবারককে বললেন: এসব বাচ্চারা আমাদেরকে পরাহত করে দিয়েছে। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন: আপনাদের তুলনায় এরাই আমার অধিক আশার পাত্র। আপনারা আর কয়দিন বাঁচবেন, আর ওরা, আশা করা যায় যে আল্লাহ তাদেরকে দীর্ঘ জীবন দেবেন। সাঈদ বলেন: তাদের মধ্যে আমাকে ছাড়া আর কেউই আজ বেঁচে নেই।‘
ইমাম আ’মাশ বলেন: আমি ইসমাঈল ইবনে রাজাকে দেখেছি, তিনি বাচ্চাদের মকতবে যেতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন; যাতে তার কথাগুলো বিস্রুত না হয়।‘
হাসান ইবনে আলী রা. তাঁর ও তাঁর বোনের ছেলেদেরকে বলতেন: ইলম শেখ; কেননা কওমের মধ্যে তোমরা এখন ছোট, আর আগামীকাল তোমরাই হবে বড়। তাই তোমাদের মধ্যে যে মুখস্থ না করে সে যেন লিখে সংরক্ষণ করে।‘ [খতিব আল বগদাদি: আল কিফায়া ফি ইলমির রেওয়ায়া]
আতা ইবনে আবি রাবাহ বাচ্চাদের উদ্দেশ্য করে বলতেন: তোমরা লেখ, আর যে ভাল করে লেখা জানে না তাকে আমরা লিখে দেব, আর যার সাথে খাতা-কলম নেই, তাকে আমরা এগুলো আমাদের কাছ থেকে দেব। [আল মুহাদ্দিসুল ফাযেল: পৃষ্ঠা ৩]
বদিউযযামান হামাদানি তার এক বোনপুত্রকে ইলম তলবে সিরিয়াস হতে বলে চিঠি লিখে বলেন:’ যতদিন ইলম নিয়ে মশগুল থাকবে, মাদ্রাসাকে তোমার থাকার জায়গা বানিয়ে রাখবে, কলমকে সঙ্গী ও খাতাকে বন্ধু বানিয়ে রাখবে ততদিন তুমি আমার সন্তান বলে স্বীকৃতি পাবে। আর যদি এ ব্যাপারে কোনো ত্রুটি হয় তবে আমি তোমার মামা নই, অন্য কাউকে মামা হিসেবে গ্রহণ করো। ওয়াসসালাম। [ আলহিদায়া আল ইসলামিয়া: ২২৮]
লুকমান হাকিম একদা তার ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলেন:’ তোমার প্রজ্ঞা অর্জন কতদূর হল? উত্তরে তিনি বললেন: আমার জন্য যা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি তাতে মাথা ঘামাই না।‘ লুকমান হাকিম বললেন: হে আমার ছেলে! আরেকটি বিষয় বাকি রয়ে গেছে, আর তাহল, তুমি আলেমদের সাথে বসবে, ভিড় ঠেলে হলেও তাদের কাছে যাবে। কেননা আল্লাহ তাআলা হেকমত দ্বারা মৃত হৃদয়গুলোকে জীবিত করেন, যেমনি জীবিত করেন বৃষ্টি বর্ষিয়ে মৃত জমিন। [ মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক: ২/১৬১] তিনি আরো বলেন: হে আমার সন্তান! তুমি তিনটি উদ্দেশ্যে ইলম তলব করো না। আর তিন কারণে ইলম তলব বন্ধ করো না –
(১) অযাচিত ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়ার জন্য ইলম তলব করো না, (২) গর্ব করার উদ্দেশ্যে ইলম তলব করো না, (৩) লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে ইলম তলব করো না।
(১) ইলম তলবে অনীহার কারণে ইলম তলব ছেড়ো না, (২) লোকলজ্জায় তুমি ইলম তলব ছেড়ো না, (৩) অজ্ঞ থাকার প্রতি রাজি হয়ে তুমি ইলম তলব ছেড়ো না।
তিনি আরো বলেন:’ আলেমদের সাথে তুমি ঝগড়া করতে যেও না, এরূপ করলে তাদের কাছে তুমি হালকা হয়ে যাবে। তারা তোমাকে প্রত্যাখ্যান করবেন। যারা নির্বোধ তাদের সাথেও বিতণ্ডায় যেও না, কেননা এরূপ করলে তারা তোমার সাথে মূর্খতাপূর্ণ আচরণ করবে, তোমাকে গালি দেবে। তুমি বরং সবর করবে, জ্ঞানে যে ব্যক্তি তোমার ঊর্ধ্বে তার জন্য, এবং যে নিচে তার জন্যও, কারণ আলেমদের সারিতে গিয়ে তারাই যুক্ত হতে পারে যারা তাদের জন্য ধৈর্য ধরবে, তাদের সাথে লেগে থাকবে। সুন্দর ও বিনম্রভাবে তাদের ইলম থেকে আহরণ করবে।‘
আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ান তার ছেলেদেরকে উপদেশ দিয়ে বলেন: তোমরা ইলম শিক্ষা করো, ইলম শিক্ষা করলে তোমরা যদি মধ্যবর্তী অবস্থানে থাক, তাহলে তোমরা নেতা হয়ে যাবে, আর যদি নিম্নবর্তী অবস্থানে থাক তা হলে বেঁচে থাকতে সক্ষম হবে।
উপরোল্লিখ উদ্ধৃতিগুলো থেকে সহজেই প্রতীয়মান হচ্ছে আমাদের সালাফে সালেহীন শিশুসন্তানদেরকে ইলম শেখাতে কতটুকু গুরুত্ব দিতেন, আগ্রহ-উৎসাহ বহন করতেন।
সালাফে সালেহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ আমাদের ছেলে সন্তানদেরকে যথার্থরূপে ইলম, জ্ঞান, ও প্রজ্ঞা শেখাতে আল্লাহ আমাদেরকে তাওফিক দান করেন।

প্রসঙ্গঃ তারাবীর সালাত

তারাবীহর সলাত


প্রশ্ন ১২৭ : তারাবীহ অর্থ কি? এ সলাতকে কেন তারাবীহ নামকরণ করা হল?
উত্তর : তারাবীহ শব্দের অর্থ বিশ্রাম করা। তারাবীহ বহু দীর্ঘায়িত একটি সলাত। প্রতি চার রাকআত শেষে যাতে একটু বিশ্রাম গ্রহণ করতে পারে সেজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে তারাবীহ।

প্রশ্ন ১২৮ : রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র তারাবীহর সালাত কী ধরণের বৈশিষ্ট মণ্ডিত ছিল?
উত্তর : লম্বা ও অনেক আয়াত এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে তিনি তারাবীহ পড়তেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ রাতের একাকী সকল সালাতই ছিল অতি দীর্ঘ। এমনকি কিয়াম, রুকু, সাজদা সবই ছিল খুব লম্বা ও ধীরস্থির।
আসসায়িব ইবনে ইয়াযিদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেছেন :
كَانَ الْقَارِئُ يَقْرَأُ بِالْمِئْيِنَ يَعْنِي بِمِئَاتِ الآيَاتِ حَتَّى كُنَّا نَعْتَمِدُ عَلَى الْعَصَى مِنْ طُوْلِ الْقِيَامِ
অর্থাৎ ইমাম (পাঠক) সাহেব তারাবীহতে শত শত আয়াত পড়তেন। ফলে সুদীর্ঘ সময় দাড়ানোর কারণে আমরা লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। (মুয়াত্তা)

প্রশ্ন ১২৯ : তারাবীহ সর্বপ্রথম কোথায় চালু হয়।
উ: আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম মসজিদে নববীতে তারাবীহর সালাত সুন্নাত হিসেবে চালু করেন।

প্রশ্ন ১৩০ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি নিয়মিত প্রত্যহ জামা‘আতের সাথে তারাবীহ পড়তেন?
উত্তর : না। সাহাবায়ে কিরাম দুই বা তিন রাত্রি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ইমামতিতে তারাবীহ পড়েছিলেন। উম্মাতের উপর এ সলাত ফরয হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরে জামাআতের সাথে মসজিদে তারাবীহ পড়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি বলেন,
وَلَمْ يَمْنَعْنِيْ مِنَ الْخُرُوْجِ إِلَيْكُمْ إِلاَّ أَنِّيْ خَشِيْتُ أَنْ تُفْتَرَضَ عَلَيْكُمْ وَذَلِكَ فِيْ رَمَضَانَ
অর্থাৎ (তারাবীহর সালাতে মসজিদে তোমরা একত্রিত হয়ে আমার জন্য যেভাবে অপেক্ষা করছিলে তা সবই আমি দেখেছি) কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল (আমি নিয়মিত এ সলাত আদায় করলে) তা তোমাদের জন্য ফরয হয়ে যেতে পারে। সে কারণে আমি (এ সালাতের জন্য) ঘর থেকে বের হইনি। আর এ ঘটনাটি ছিল রমযান মাসের ( কোন এক রাতে)। (বুখারী ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৩১ : তারাবীহর সলাত কত রাক‘আত?
উত্তর : এটি একটি ইখতিলাফী অর্থাৎ মতবিরোধ পূর্ণ মাস্আলা। কেউ কেউ বলেছেন বিতরসহ তারাবীহ ৪১ রাক‘আত। অর্থাৎ বিতর ৩ রাকআত হলে তারাবীহ হবে ৩৮ রাক‘আত। অথবা বিতর ১ রাকআত ও তারাবীহ ৪০ রাকআত। এভাবে তারাবীহ ও বিতর মিলে :
কেউ বলেছেন ৩৯ রাকআত (তারাবীহ ৩৬ + বিতর ৩)
কেউ বলেছেন ২৯ রাকআত (তারাবীহ ২৬ + বিতর ৩)
কেউ বলেছেন ২৩ রাকআত (তারাবীহ ২০ + বিতর ৩)
কেউ বলেছেন ১৯ রাকআত (তারাবীহ ১৬ + বিতর ৩)
কেউ বলেছেন ১৩ রাকআত (তারাবীহ ১১ + বিতর ৩)
কেউ বলেছেন ১১ রাকআত (তারাবীহ ৮ + বিতর ৩)
(ক) বিতর ছাড়া ২০ রাক‘আত তারাবীহ সলাতের পক্ষে দলীল হল মুসান্নাতে আঃ রায্যাক হতে বর্ণিত ৭৭৩০ নং হাদীস, যেখানে বর্ণিত হয়েছে :
أَنَّ عُمَرَ جَمَعَ النَّاسَ فِي رَمَضَانَ عَلَى أُبَي بنِ كَعَبٍ وَعَلَى تَمِيْمِ الدَّارِيْ عَلَى إِحْد‘ى وَعِشْرِيْنَ مِنْ رَكْعَةِ يَقْرَؤُنَ بِالْمَئِيين
উমার (রাযি.) রমযানে উবাই ইবনে কাব ও তামীম আদদারীকে ইমামতিতে লোকদেরকে একুশ রাকআত সলাতের প্রতি জামাআতবদ্ধ করেছিলেন। (অর্থাৎ তারাবীহ ২০ ও বিতর ১ রাকআত)
(খ) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেছেন যে,
كَانَتْ صَلاَةُ النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- ثَلاَثَ عَشَرَةَ رَكْعَةً يَعْنِيْ مِنَ اللَّيْلِ
“নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র রাতের সালাত ছিল ১৩ রাক‘আত।” (বুখারী ও মুসলিম)
(গ) মা আয়িশাহ  বলেন,
مَا كَانَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ غَيْرِهِ عَلَى إِحْد‘ى عَشَرَةَ رَكْعَةً
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ও অন্য সময়ে (রাতে) ১১ রাকআতের অধিক সলাত আদায় করতেন না। (বুখারী ও মুসলিম)
(ঘ) ইবনে ইয়াযিদ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন,
أَمَرَ عُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أُبَيْ بْنِ كَعَبٍ وَتَمِيْمَا الدَّارِيِّ أَن يَّقُوْمَ لِلنَّاسِ بِإحْد‘ى عَشَرَةَ رَكْعَةٍ
‘উমার ইবনু খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু (তার দুই সঙ্গী সাহাবী) উবাই ইবনে কাব তামীম আদদারীকে এ মর্মে নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন লোকদেরকে নিয়ে (রমযানের রাতে) ১১ রাকআত কিয়ামুল্লাইল (অর্থাৎ তারাবীহর সলাত) আদায় করে। (মুয়াত্তা মালেক)
উল্লেখ্য যে, সৌদী আরবের মসজিদগুলোতে তারাবীহ ও বিতর মিলে ১১ বা ১৩ রাকআত পড়লেও মাক্কার হারামে ও মাদীনার মসজিদে নববীতে তারাবীহ ২০ এবং বিতর ৩ মিলিয়ে মোট ২৩ রাকআত পড়ে থাকে।

প্রশ্ন ১৩২ : তারাবীহর সংখ্যার মতবিরোধের মধ্যে কোনটি সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য?
উত্তর : মালেকী মাযহাবের ইমাম মালেক (রহঃ) বলেছেন, একশ বছরেরও বেশী সময় ধরে লোকেরা ৩৬ রাকআত তারাবীহ পড়েছে। শাফেঈ মাযহাবের ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেছেন যে, তিনি তারাবীহ মদীনায় ৩৬ এবং মাক্কায় ২০ রাকআত পড়তে দেখেছেন। সৌদী আরবের গ্র্যান্ড মুফতী সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেমে দ্বীন আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমীন (রহ.) ১০ ও আট রাকআতের মাসআলাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
এজাতীয় মত পার্থক্যের সমাধানকল্পে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহ.) বলেছেন, অধিক সংখ্যক রাকআত পড়াই উত্তম। আর যদি কেউ কম সংখ্যক রাকআত পড়তে চায় তাহলে তার উচিত হবে তিলাওয়াত, কিয়াম, রুকু ও সিজদা দীর্ঘ করা। তিনি আরো বলেছেন যে, তারাবীহকে রাকআত সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সময় ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ১১ রাকআতের মধ্যে ৫ ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করেছেন। সালাতের কিয়ামে এত দীর্ঘ সময় কেটে যেত যার কারণে সাহাবীগণ লাঠির উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
সবশেষে ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা (রহঃ) আরেকটি মত ব্যক্ত করে বলেছেন যে, সার্বিক বিশ্লেষণে তারাবীহ ২০ রাকআত পড়াই উত্তম। কারণ এটা ১০ ও ৪০ রাকআতের মাঝামাঝি এবং বেশির ভাগ মুসলমানের আমলও এরই উপর।
তবে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, আমাদের দেশে তারাবীহ যেভাবে তাড়াহুড়া করে পড়া হয় তা পরিহার করে বিশুদ্ধ ও ধীরস্থির তিলাওয়াত, রুকু থেকে উঠার পর এবং দু’ সিজদার মাঝে আরো একটু সময়ক্ষেপণ করা, সুন্নাত মোতাবিক ও ধীরস্থিরভাবে রুকু-সিজদাহ ইত্যাদি সুন্দর করে তারাবীহ আদায় করা অত্যাবশ্যক। যে পদ্ধতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সলাত আদায় করতেন আমাদেরও উচিত সে তরীকামত আদায় করা।

প্রশ্ন ১৩২ : তারাবীহ ও তাহাজ্জুদের ফযীলত জানতে চাই।
উত্তর : (ক) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَانًا وَّاِحْتِسَابًا غُفِرَلَهُ مَاتَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমান অবস্থায় সাওয়াবের আশায় রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ আদায় করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্ববতী (সগীরা) গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। (বুখারী ও মুসলিম)
إِيْمَانًا ঈমান অবস্থায় অর্থ হল, এমন বিশ্বাস স্থাপন করা যে, আল্লাহ তাকে এ কাজের বদলা দিবেন এবং اِحْتِسَابًا অর্থ হল, এমনভাবে সাওয়াব আশা করবে যে, রাতের এ সালাত আদায় কোন মানুষকে দেখাবার বা শুনাবার জন্য নয় বরং শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশি করার জন্য এবং তা শুধুমাত্র আল্লাহরই কাছ থেকে পুরস্কার লাভের আশায়।
(খ) অন্য হাদীসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
أََفْضَلُ الصَّلاَةِ بَعْدَ الْفَرِيْضَةِ صَلاَةُ اللَّيْلِ
ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হল রাতের সালাত (অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সালাত)। (মুসলিম)

প্রশ্ন ১৩৩ : তারাবীহ সলাতের জামাআতে নারীদের শরীক হওয়া কি জায়েয?
উত্তর : ফিতনা-ফ্যাসাদের আশঙ্কা না থাকলে মাসজিদে তারাবীহর জামা‘আতে হাজির হওয়া মেয়েদের জন্য জায়েয আছে।
আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لاَ تَمْنَعُوْا إِمَاءَ اللهِ مَسَاجِدَ اللهِ
“তোমরা আল্লাহর বান্দা নারীদেরকে মাসজিদে যেতে নিষেধ করো না।”


প্রশ্ন ১৩৪ : নারীরা মাসজিদে গেলে তাদের চালচলন ও পোষাক আশাক কী ধরনের হওয়া উচিত?
উত্তর : সম্পূর্ণ শরীয়াতসম্মত পর্দা করে মসজিদে যাবে। বাহারী ও রঙ বেরঙের বোরকা ও টাইট-ফিট পোষাক পরবে না। গল্পগুজব ও আওয়াজ করে কথা বলবে না। মেয়েদের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে সালাত আদায় করবে। ইমাম সাহেব সালাম ফিরানোর পরপরই মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাবে।


প্রশ্ন ১৩৫ : জামাআতে সালাত আদায় করলে নারীদের কোথায় দাঁড়ানো উত্তম?
উত্তর : নারীরা পিছনে দাঁড়াবে। এটাই সুন্নাত। তারা যত পিছনে দাঁড়াবে ততই উত্তম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
خَيْرُ صُفُوْفِ الرِّجَالِ أَوَّلُهَا وَشَرُّهَا آخِرُهَا وَخَيْرُ صُفُوْفِ النِّسَاءِ آخِرُهَا وَشَرُّهَا أَوَّلُهَا
পুরুষদের উত্তম কাতার হলো প্রথম কাতার আর নিকৃষ্ট হলো শেষ কাতার। পক্ষান্তরে মহিলাদের জন্য উত্তম হলো শেষ কাতার আর নিকৃষ্ট হলো প্রথমকাতার। (মুসলিম)

____________________________________________________
[রামাদ্বান মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। এই মাসের আমল গুলো পূর্ণ ভাবে করতে চাই সঠিক সুন্নাহ ভিত্তিক জ্ঞান। আপনাদের কাছে সেই জ্ঞান ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যে রামাদ্বান সম্পর্কিত আর্টিকেল,ফতোয়া, বই, অডিও লেকচার দিয়ে সাজানো হয়েছে আমাদের রামাদ্বানের পাথেয় সেকশনটি, এখানে রমযান সম্পর্কিত আপনার জিজ্ঞাসার উত্তর গুলো পেয়ে যাবেন আশা করছি। নিজে পড়ুন, শুনুন এবং আপনাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। এই রামাদ্বান কে পরিনত করুন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমযানে, এই রামাদ্বান মাস কে পরিণত করুন আপনার জীবনের সেরা সময়ে ইনশাআল্লাহ্‌।]
____________________________________________________
উৎস:
প্রশ্নোত্তরে
সিয়াম

মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭

“নামায-ন্যায়পরায়ণতার প্রোগ্রামিং পর্ব ২”

মন নিয়ন্ত্রন রাখার উপায়ঃ
আমাদের মন ঘুরে বেড়ায় কেন?এর কারণ হল আমাদের মন আসলে খালি।আর এই মন খালি থাকতে পারে না। সে জন্যে মন ঘুরে বেড়ায়।আমরা যে সূরাগুলো নামাযে পড়ে থাকি বেশিরভাগ মুসলিম তা জানেন।সূরা ফাতিহা, পবিত্র কুর’আনের কিছু আয়াত,কয়েক্টা ছোট ছোট সূরা-এগুলো আমরা নামাযে পড়ি।আমরা মুসলিমরা এগুলো এত যান্ত্রিকভাবে পড়ি যে, আপনি যদি কোন মুসলিমকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে সূরা ফাতিহা বলতে বলেন,সে এই কাজটা একশ মেইল স্পীড এ করতে পারবে।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আলহামদুলিল্লাহি রাবিইল আ’আলা-মীন।
আর-রাহমা-নীর রাহীম।
মা-লিকি ইয়াওমিদ্দি্ন।
ইয়্যা কানা বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাইন।
ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম।
সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম।
গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দ-ল্লিন।

আমীন।

একেবারেই যান্ত্রিকভাবে উচ্চারণ করি।আমাদের মনের খুব সামান্য একটা অংশ এখানে ব্যস্ত থাকে।আমরা বেশিরভাগ মুসলমান অনারব।আমরা আরবী ভাষার কথাবার্তা বুঝতে পারিনা।আর সেহেতু আমরা নামাযে যেটা পড়ছি সেটা বুঝতে পারছিনা।তখনই এই সম্ভাবনা দেখা দেয় যে আমাদের মন অন্য চিন্তা করবে।তাই মন যাতে এসব চিন্তা না করতে পারে সেজন্য আরবীটা পড়ব আর একইসাথে আমরা এই আরবী আয়াতগুলোর অর্থ বুঝতে চেষ্টা করব।যদি ইংরেজি জানেন তবে ইংরেজি অনুবাদটা মনে করেন।উর্দু জানলে উর্দু অনুবাদটা মনে করেন।বাংলা জানলে বাংলা অনুবাদটা মনে করেন।যে ভাষাটা আপনি সবচেয়ে বেশি ভাল বোঝেন সেই ভাষায় অনুবাদটা মনে করেন।যেমন ধরেন আমরা যখন সূরা ফাতিহা পড়ি-
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (পরম করুনাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে)
আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন(সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি জগতস্মূহের প্রতিপালক)
আর রাহমানীর রাহীম(যিনি করুণাময় ও পরম দয়ালু)
মালিকি ইয়াওমিদ্দিন(তিনি বিচার দিনের মালিক)
ইয়্যা কানা বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাইন(আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি)
ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম(আমাদেরকে সরল পথ দেখাও)
সিরাতাল্লাযীনা আন আমতা আলাইহিম(তাদের পথ যাদেরকে তুমি অনুগ্রহ দান করেছ)
গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ্দ-ল্লিন(তাদের পথ নয় যারা ক্রোধে নিপাতিত ও পথভ্রষ্ট)
যখন এই সূরা ফাতিহা পড়বেন বা আরবীতে অন্য আয়াত পড়বেন একইসাথে অর্থটাও মনে করুন।আর আপনার মন তখন ঘুরে বেড়াবে না।কারন এতে করে আপনি নামাযে যে আয়াত পড়ছেন সেটার অর্থ মনে রাখতেই আপনার মন ব্যস্ত থাকছে।কিন্তু কয়েকদিন পরে বা কয়েক মাস পরে এটাও একেবারে যান্ত্রিক হয়ে যাবে।আমাদের মন খুব শক্তিশালী।এখানেও সম্ভাবনা থাকে যে মন অন্য চিন্তা করবে।কিন্তু এই সম্ভাবনাটা কম।কারণ মনের এক অংশ তখন আরবী পড়ায় ব্যস্ত থাকবে আর আরেক অংশ তখন অর্থ মনে করবে।অন্য চিন্তা করার সম্ভাবনা কম।তারপরও মন চিন্তা করতে পারে।মনের এই চিন্তাগুলো দূর করার জন্য আপনি আরবীতে আয়াতগুলো পড়বেন আর সেগুলোর অর্থ মনে করবেন।আপনি মনোযোগ দিয়ে আয়াতগুলো পড়বেন আর অর্থ মনে করবেন।একটা মানুষ দুইটা জিনিসের উপর একসাথে ১০০ ভাগ মনোযোগ দিতে পারেনা।দুইটা জিনিসের উপর ৫০ ভাগ মনোযোগ দেয়া যায়বা ৮০ ভাগ,২০ ভাগ।কিন্তু ১০০ ভাগ দুইটা আলাদা জিনিসের উপর মনোযোগ কেউই দিতে পারবে না।তাহলে যত বেশি মনোযোগ দেবেন আপনার মন তত কম ঘুরাঘুরি করবে।অর্থাৎ,মনের এই ঘুরাঘুরি বন্ধ করতে আমরা আরবী আয়াতগুলো পড়ব এবং একইসাথে সেগুলোর অর্থ বুঝে মনে করার চেষ্টা করব।তাহলে ইনশা’আল্লাহ আমাদের মন ঘুরাঘুরি করবেনা।আমার লেকচারের প্রথমে পবিত্র কুর’আনের একটি আয়াত বলেছিলাম।সূরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-
“পড় সেই কিতাব হতে যা তোমার প্রতি নাযিল করা হয় এবং নিয়মিত নামায কায়েম কর।কারণ অবশ্যই নামায তোমাদের অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে।“
পবিত্র কুর’আন বলছে যে,নামায আপনাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ হতে বিরত রাখে।য়ামি আগেও বলেছি নামায হল এক ধরনের প্রোগ্রামিং।এই প্রোগ্রামিংটা হল ন্যায় নিষ্ঠার জন্য।আর আমরা মুসলিমরা দিনে পাঁচ বার নামাযের মাধ্যমে প্রোগ্রামড হই।আমরা আল্লাহর কাছে এই সময়ে নির্দেশনা চাই।ইহদিনাস সিরাতাল মুসতাকিম-আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।আর আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলা এর উত্তর দেন।তিনি আমাদেরকে ন্যায়পরায়ণতার পথে প্রোগ্রামড করেন।যেমন ধরেন কোন ঈমাম সূরা ফাতিহার পরে পড়তে পারেন-
সূরা মায়িদার ৯০ নং আয়াতে বলা হয়েছে-
তর্জমাঃ “হে মুমিনগণ!নিশ্চই মদ ও জুয়া ঘৃণ্য বস্তু।মূর্তিপূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর,এইগুলি সব শয়তানের কাজ।তোমরা এগুলো বর্জন কর,যাতে সফলকাম হতে পার।“
এখানে নামাযে আমাদের প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে যে,মদপান করা,জুয়া খেলা,বিভিন্ন মূর্তির পূজা,ভাগ্য গণনা করা আমাদের বাদ দিতে হবে।কারণ এগুলো সব শয়তানের কাজ।
ঈমাম সূরা ফাতিহার পরে পড়তে পারেন সূরা মায়িদা’র ৩ নং আয়াত-
তর্জমাঃ
“তোমাদের জন্য যেসব হারাম করা হয়েছে-মৃত পশু,রক্ত,শূকরের মাংস খাওয়া এবং যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে।“

এ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে,এখানে আমাদেরকে প্রোগ্রাম করা হচ্ছে খাবারের মধ্যে হারাম বিষয়গুলি সম্বন্ধে।আর এই হারাম খাবারগুলো হল মৃত জন্তু,রক্ত,শূকরের মাংস এবং যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে।আমাদের প্রোগ্রামিং করা হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতার জন্য।
চলবে ইনশা’আল্লাহ।

“নামায-ন্যায়পরায়ণতার প্রোগ্রামিং”পর্ব-১

জাকির নাইকঃ
শ্রদ্ধেয় গুরুজনেরা এবং আমার প্রিয় ভাই ও বোনেরা, স্বাগত জানাই ইসলামিক সম্ভাষণে,আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।আল্লাহ তা’আলার শান্তি,দয়া আর রহমত বর্ষিত হোক আপনাদের সবার প্রতি।আজকের এই বক্তব্যের বিষয়-“নামায-ন্যায়পরায়ণতার প্রোগ্রামিং”।বেশির ভাগ মানুষ সালাহ শব্দটার বাংলা অনুবাদ করে প্রার্থনা করা। এই প্রার্থনা শব্দটা দ্বারা আরবী সালাত শব্দেটি পুরোপুরি প্রকাশ করে না।প্রার্থনা করা মানে অনুরোধ করা।বিনীতভাবে কিছু চাওয়া।যেমন,আদাওতে গেলে আপনি প্রার্থনা করেন।প্রার্থনা করা মানে মিনতি করা।সাহায্যের আবেদন করা।দোয়া করা।সেটাই হল আবেদন বা প্রার্থনা।তবে নামাযের মানে শুধু প্রার্থনা নয়।প্রার্থনার চেয়ে বেশি কিছু।কারণ নামাযে আমরা আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি তাঁর গুণগান করি।আমরা তাঁর কাছ থেকে নির্দেশণা পাই।আর এসবের পাশাপাশি নামায হল এক ধরণের প্রোগ্রামিং।এটা একটা শর্তাধীন অবস্থা।অথবা একজন সাধারণ মানুষের ভাষায় এটা হল ব্রেইন ওয়াশিং।তবে কেউ যদি নামায পড়তে যায়,আর কেউ যদি তাকে জিজ্ঞেস করে আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আর সে যদি বলে ব্রেইন ওয়াশিং এ যাচ্ছে অথবা প্রোগ্রামিং এ যাচ্ছে এটা শুনতেই অদ্ভুত লাগবে।সেজন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু মনে করিনা যদি মানুষ আরবী সালাত শব্দটাকে বাংলায় প্রার্থনা বলে।কিন্তু তাদের এটা মনে রাখতে হবে যে,নামায আসলে প্রার্থনার চাইতে অনেক বেশি কিছু।যখনই আপনারা প্রোগ্রামিং কথাটা শোনেনে তখন আপনারা কম্পিউটারের কথা ভাবেন।যদি আপনি ধরে নেন যে, মানুষ একটা যন্ত্র তাহলে আমি বলব এ যন্ত্রটা হল পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল যন্ত্র।পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটারের চেয়ে মানুষ অনেক বেশি জটিল।আর আমরা মানুষ জাতি আশরাফুল মাখলুকাত।আল্লাহ সুবহানা ওয়া তা’আলার সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।আর পবিত্র কুর’আনে সূরা তীন এর ৪ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে-

তর্জমাঃ “নিশ্চই আমি তো মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতম গঠনে।”

মনোবিজ্ঞানীরা আমাদের বলেন যে আমাদের মন পুরোপুরিভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।শরীর সরাসরিভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে।যদি আমরা হাত উঠাতে চাই,উঠাতে পারব।নামাতে চাই,নামাতেও পারব।যদি আমি এক পা সামনে আগাতে চাই,সেটাও পারব।আমাদের শরীর সরাসরিভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে।কিন্তু আমাদের মন সরাসরিভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়।সেজন্য আপনারা হয়ত দেখে থাকবেন আমরা যখন নামায পড়ি আমাদের মন তখন শুধু গুরে বেড়ায়।যেমন একজন ছাত্র যদি পরীক্ষা দেয়ার পর নামায পড়ে তবে সেই সময় তার পরীক্ষার খাতার কথাই চিন্তা করতে থাকে।সে তখন ভাবতে থাকে,আমি দুই নম্বর প্রশ্নের যে উত্তরটা লিখেছি সেইটা না লিখে আমার এইটা লিখা উচিত ছিল।যদি একজন ব্যবসায়ী নামায পড়ে সে চিন্তা করতে থাকে যে আজকে আমি কতখানি লাভ করলাম,কতগুলো জিনিস আজকে বিক্রি করলাম।যদি একজন গৃহিনী নামায পড়ে তখন হয়ত ভাবতে পারে যে, আমার স্বামীর জন্য কি রান্না করব,বিরিয়ানি নাকি পোলাও? এটা খুবই স্বাভাবিক যে নামাযের সময় আমাদের মন শুধু এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়।


আমাদের মন কেন ঘুরে বেড়ায়?…চলবে ইনশাআল্লাহ।

আল-ওয়াহান; মুসলিমদের একটি ঘাতক ব্যাধি

১৯৯৫ সাল। বসনিয়ার সারাজেভোতে মুসলিমদের মৃতদেহ পড়ে আছে

“আমরা এমন জাতি যারা নিতান্ত তুচ্ছ, নীচু জাত ছিলাম, আল্লাহ আমাদের মর্যাদা উঁচু করে দিয়েছেন ইসলামের মাধ্যমে। আমরা যদি অন্য কোন উপায়ে সম্মান কামনা করি, তবে আল্লাহ আবারো আমাদের নীচু করে দেবেন”। ~ উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু

‘যারা মুসলমানদের বর্জন করে কাফেরদেরকে নিজেদের বন্ধু বানিয়ে নেয় এবং তাদেরই কাছে সম্মান প্রত্যাশা করে,অথচ যাবতীয় সম্মান শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য’। (3:139)
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘শীঘ্রই মানুষ তোমাদেরকে আক্রমন করার জন্য আহবান করতে থাকবে, যেভাবে মানুষ তাদের সাথে খাবার খাওয়ার জন্য একে-অন্যকে আহবান করে।’
জিজ্ঞেস করা  হলো, ‘তখন কিআমরা সংখ্যায় কম হবো?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমরা সংখ্যায় হবে অগণিত কিন্তু তোমরা সমুদ্রের ফেনার মতো হবে, যাকে সহজেই সামুদ্রিক স্রোত বয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহ তোমাদের শত্রুর অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে আল-ওয়াহ্হান ঢুকিয়ে দিবেন।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.),আল– ওয়াহ্হান কি?’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং ক্বিতালকে অপছন্দ করা।’ (মুসনাদে আহমদ, খন্ডঃ ১৪, হাদিস নম্বরঃ ৮৭১৩, হাইসামী বলেছেনঃ হাদিটির সনদ ভালো, শুয়াইব আল আর নাউতের মতে হাদিসটি হাসান লি গাইরিহি)
সাওবান (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছেঃ
حُبُّ الْحَيَاةِ وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ
‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।’ (সুনানে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদ, হাদিস হাসান)
এই হাদিস নিয়ে একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায় আসলেই রাসুল(সা.)-কে ‘অল্পকথায় অনেক কথা প্রকাশ করা’র ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিলো। “আমাকে এমন কথা (বলার ক্ষমতা) দেয়া হয়েছে যা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অর্থ ব্যাপক ” [বুখারী মুসলিম]
ওয়াহহান সম্পর্কিত আলোচ্য হাদীসে মাত্র কয়েকটি বাক্য রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যেই মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থা, তাদের মূল সমস্যা এবং তার সমাধান নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই হাদিস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তভাবে নীচে উল্লেখ করা হলো:-
(১) ‘তোমাদেরকে আক্রমণ করার জন্য লোকজন একে অন্যকে আহবান করবে, যেভাবে খাবারের জন্য আহবান করা হয়।’
এই হাদীসের অসাধারণ একটি বিষয় হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শ্রোতাদের মনের সামনে যেন একটি বাস্তব স্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এখানে, মুসলিম উম্মাহকে প্রথমে তুলনা করা হয়েছে, কিছু ক্ষুধার্ত লোকের সামনে রাখা সুস্বাদু খাবারের সাথে। কিন্তু, যেহেতু তারা ভাগাভাগি করে খাবে একারণে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশ থেকে ভাগ নিতে চাইবে, ফলে খাদ্যটি ভাগ হয়ে যাবে ‘আমন্ত্রিত অতিথি’র মর্যাদা ও ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে।
খিলাফত পতনের অল্প কিছু সময় পর থেকেই, মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে দেয়া হল বিভিন্ন রাষ্ট্রে, ইউরোপিয় দখলদারি শক্তি এটা করেছিল। এবং তাদের প্রত্যেকেই এরপর নজর দিল মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহ যে প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়েছেন সেদিকে।
সত্যিই বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ দলে দলে বিভক্ত, আল- কুরআনও সুন্নাহ হতে দূরে সরে যাওয়ার কারণে। এই অবস্থায় দুনিয়ার অন্যান্য জাতি, মুসলিম উম্মাহর উপর সরাসরি আক্রমণ চালাচ্ছে এবং একে অন্যকে আক্রমণের জন্য উৎসাহ দিচ্ছে, একদেশের মুসলিমদের আরেক দেশের মুসলিমদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছে এবং যুদ্ধ সৃষ্টি করেছে। যেমন : ইরাক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ফিলিস্তান, কাশ্মীর ইত্যাদি-সেটা তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য হোক অথবা খনিজ সম্পদ দখলের জন্য হোক অথবা অর্থনৈতিক বাজার দখল করার জন্য হোক।
কেউ আক্রমণ করছে সরাসরি আগ্রাসী সেনাবাহিনী পাঠিয়ে, কেউবা কুটনৈতিক (diplomacy) এর মাধ্যমে, কেউবা আদর্শিকভাবে (ideologically), কেউবা সংবাদ মাধ্যম, প্রিন্ট কিংবা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে, কেউবা তাদের আবিস্কৃত শিক্ষা-ব্যবস্থা রপ্তানী করে তাদের মানসিক দাস তৈরির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই মানসিক দাসেরা পশ্চিমা দেশের অপ সংস্কৃতিকে মনে করে আধুনিকতা আর ইসলামের পবিত্রতা আর সুস্থ সামাজিক ব্যবস্থাকে মনে করে পশ্চাদপদতা, তারা কুফফারদের পরিচালিত গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, মানব রচিত মতবাদ গ্রহণ করতে মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করে আর ইসলামের শিক্ষা অনুসারে দেশ, রাষ্ট্র পরিচালনা করতে বাধা দেয় ।আর এক্ষেত্রে তারা ‘গণতন্ত্র রক্ষা, মানবতা, নারী-মুক্তি, শিশু-অধিকার, সবার জন্য শিক্ষা, সামাজিক-উন্নয়ন’ ইত্যাদি বিভিন্ন মনভুলানো চটকদার শব্দের মোড়কে তাদের এই দালালী কার্যক্রমকে ঢেকে নিয়েছে।
বস্তুতঃ ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস করার পর থেকেই পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর উপর এই আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে অনবরত, এটা যারাই আল-কুরআনে বর্ণিত আনআম (গবাদি-পশু) এর মতো নয়, তারাই জানেন ও বুঝেন।
(২) দ্বিতীয় : ‘তখন কি আমরা সংখ্যায় কম হবো?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমরা তখন অগণিত হবে।’

এখান থেকে বুঝা যায়, বেশি সংখ্যক হওয়া ইসলামের কোন পূর্বশর্ত নয়। ইসলাম চায় মানসম্পন্ন মুসলিম,যারা আল্লাহর দীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। সংখ্যা এখানে মূখ্য নয়। আল্লাহ চেয়েছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আমলে উত্তম’ (আ’মালুন সালিহান), এটা চাননি যে, ‘তোমাদের মধ্যে কে আমলে বেশি’ (আ’মালুন কাছিরান)।
বদরের যুদ্ধে কাফিরদের সংখ্যা ছিলো মুসলিমদের তিনগুণ। ইয়ারমুকের যুদ্ধে কাফিররা ছিলো মুসলিমদের ৭০ গুণ। উভয় যুদ্ধেই মুসলিমরা বিজয়ী হয়। অপরদিকে, হুনায়ুনের যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা ছিলো, কাফিরদের চেয়ে বেশি। কিন্তু সে যুদ্ধে তারা পরাজয়ের সামনে পৌঁছে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে আল্লাহর রহমতে বিজয় আসে। আফসোস, বর্তমান মুসলিম উম্মাহ, তাদের সংখ্যাধিক্যের পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যস্ত, কোন ধর্ম সবচেয়ে বেশি গতিতে বেড়ে চলেছে, কোনদেশে মুসলিম Growth rate কত ইত্যাদি ব্যাপার নিয়ে তারা ব্যস্ত; কিন্তু মুসলিমদের মান নিয়ে কোন চিন্তা হচ্ছে না। অথচ আল্লাহ আল-কুরআনে বারবার বলেছেন, বিজয় শুধুমাত্র তাঁর কাছ থেকে আসে, আর তাঁর বিজয় দানের ওয়াদা শুধু মুমিনদের জন্য।
দেড়শ কোটি মুসলিমের এত বিশাল সংখ্যাও কোন কাজে আসছে না, কারণ অধিকাংশ জনতা মানসিকভাবে পশ্চিমা দেশ ও তাদের আদর্শের দাসত্ব করে আসছে। রাখাল যেভাবে তার খেয়াল খুশি মত পালের ভেড়াদের যেদিকে খুশি সেদিকে নিয়ে যায়, এই পশ্চিমাদেশগুলোও আমাদের মুসলিমদের সেভাবে পালের ভেড়া বানিয়ে রেখে মানসিকভাবে গোলামে পরিণত করে রেখেছে।
(৩) তৃতীয়ত : ‘তোমরা হবে সমুদ্রের ফেনা রাশির মতো, যা স্রোতে সহজেই ভেসে যায়।’

এটা হচ্ছে, বেশি সংখ্যক হওয়ার পরও মুসলিম উম্মাহর এই অবস্থার একটি অসাধারণ বর্ণনা।
-সাগরের ফেনা বিপুল পরিমাণ পানির উপর ভেসে থাকে ঠিকই, বিপুল জলরাশি নিয়ে সে গর্ব করে, এই জলরাশি তার কোন কাজে আসে না। তার নিজের কোন দৃঢ় অবস্থান নেই।
-সাগরের ফেনার যেভাবে কোন শক্তি নেই, শুধু উপর থেকে দেখতে অনেক মনে হয়, অন্যদিকে নিচের পানির স্রোত তাকে যেদিকে ইচ্ছা নিয়ে যায়।
-ফলে এই সংখ্যা নিয়ে গর্ব করা এক প্রকার মিথ্যা আত্মতুষ্টি অনুভব করা।
-নিজেকে চালিত বা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ফেনারাশির নেই, সাগরের ফেনাকে নিয়ন্ত্রণ করে নিচের জলরাশি।
মুসলিম উম্মাহও সংখ্যায় বেশি, কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তাদের কোন ভূমিকা কিংবা অবস্থান নেই। তাদের প্রতিটি দেশই সুদভিত্তিক অর্থনীতি দিয়ে পরিচালিত, আল- কুরআন সুন্নাহ বিবর্জিত পশ্চিমাবাদের আবিস্কৃত গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-পুঁজিবাদী-
রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তাদের দেশগুলি পরিচালিত হচ্ছে। আর ইসলামের গন্ডি শুধুমাত্র মসজিদ ও কতিপয় পারিবারিক আইনে সীমাবদ্ধ। এ যেন সংখ্যায় বেশি হয়েও তারা সংখ্যালঘু. কাফের-মুশরিক-ইসলামের শত্রুরা ঔদ্ধত্যের সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে কিন্তু মুসলিমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের একটি কথাও বলতে পারে না। অথচ সমুদ্রের ফেনা রাশির মতোই মুসলিম উম্মাহ ও সংখ্যাধিক্য নিয়ে আনন্দিত, উল্লাসিত, গর্বিত।
(৪) চতুর্থত : ‘আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর থেকে তোমাদের ভয় দূর করে দিবেন এবং তোমাদের মধ্যে আল-ওয়াহ্হান ঢুকিয়ে দিবেন।’

এখান থেকে দুটি বিষয় প্রতীয়মান হয়।
ক. মুসলিমদের শত্রু আছে, মিত্র আছে। ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদী ধর্ম নয়, কিংবা ‘অহিংস পরমধর্ম’ প্রকৃতির গৌতমীয় বাণীতে বিশ্বাস করে না। বরং, ইসলামে ভালোবাসা ও ঘৃণা (আন ওয়ালা ওয়াল বা’রা)একটি গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট। অনেক আধুনিকএবং পরাজিত মন মানসিকতার অধিকারী মুসলিম যাদের মন-মগজ পশ্চিমা শিক্ষা-ব্যবস্থা, ডিস, ইন্টারনেট প্রভৃতির মাধ্যমে সঠিক ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে গেছে, তারা যতই এ ব্যাপারটায় তাদের বিদেশি বন্ধুদের কাছে অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েন না কেন। আল্লাহর রহমত, তিনি আল-কুরআন ও সহীহ হাদিসকে অবিকৃত রেখেছেন। না হলে এরা ইসলামকে বিকৃত করে কোথায় নিয়ে যেতো। আল্লাহ বলেন :
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইয়াহূদ ও নাসারাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের মধ্যেই গণ্য হবে। আল্লাহ জালিমদেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’ (সুরা-মায়েদা : ৫১)
মুসলিমদের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বাদ দিয়ে, বিজাতীয় প্রভুদেরকে বন্ধু অভিভাবক করে নেওয়ার কোন সুযোগ নেই।
খ. মুসলিমদের উচিত তাদের শত্রুদেরকে ভীত সন্ত্রস্থ রাখা। আর তাদের অন্তরে আমাদের ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক । যদি না থাকে, বুঝতে হবে, কোন সমস্যা আছে। কারণ রাসুল (সা.), আমাদের দুরবস্থার একটি কারণ হিসেবে তাদের মনে, আমাদের ভয় না থাকাকে উল্লেখ করেছেন।
আর আল্লাহ তো পবিত্র কুরআনে ঘোষণাই দিয়েছেন, যা বেশির ভাগ মুসলিম সেনাবাহিনী তাদের কুচকাওয়াজে না বুঝে মন্ত্রের মতো পাঠ করে থাকে।
‘আর তাদেরকে মুকাবিলা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-বাহিনী সদা প্রস্তুত রাখবে যদ্দ্বারা তোমরা ভয় দেখাতে থাকবে আল্লাহর শত্রু আর তোমাদের শত্রুকে, আর তাদের ছাড়াও অন্যান্যদেরকেও যাদেরকে তোমরা জান না কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানেন।তোমরা আল্লাহর পথে যা খরচ করো তার পুরোপুরি প্রতিদান তোমাদেরকে দেওয়া হবে, আর তোমাদের সাথে কখনো জুলুম করা হবে না।’ (সুরা-আনফাল : ৬০)
তাই কাফিরদের মনে ভয়-ত্রাস সৃষ্টি করা মুসলিমদের উপর আল্লাহ প্রদত্ত ফরজ। কে আছে এমন যে আল্লাহর এই হুকুমকে অস্বীকার করতে পারে। আর এক্ষেত্রে মুসলিমরা শুধু ‘চোরের কাছে পুলিশ যে রকম ত্রাস সৃষ্টি করে’ যা ডা. জাকির নায়েক বলে থাকেন, সে রকম ত্রাস সৃষ্টিকারী নয়, বরং ‘সুলায়মান (আ.) যেভাবে বিলকিসের রাজত্বে তার শিরকের কারণে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন’ সে রকমও ত্রাস সৃষ্টিকারী।
এটা ছিলো, আমাদের প্রথম সমস্যা, আর দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের মাঝে ‘ওয়াহ্হান’ ঢুকিয়ে দিবেন।
(৫)পঞ্চমত :‘জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.), ওয়াহ্হানকি?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং ক্বিতালকে অপছন্দ করা’ অথবা মৃত্যুকে অপছন্দ করা।

সিরিয়ান মুজাহিদদের ট্রেনিং
এখানে সমস্যা এবং সমাধান দুটোই চিহ্নিত করে দেয়া হয়েছে, পুঁজিবাদী ও সমাজাতান্ত্রিক বস্তুবাদী আদর্শ যখন মুসলিম দেশগুলোতে রপ্তানি করা হল, তখন থেকে মুসলিমরা নিজেদের স্বভাববিরুদ্ধ রকমের বস্তুবাদী ও ভোগবাদী হয়ে গেল, দুনিয়ার সোনার হরিণের পিছনে ছুটতে লাগল। আখিরাতের জীবনের কথা বেমালুম ভুলে গেল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরেকটি হাদীসে বলেছেন,
“সুখ শান্তি বিনষ্টকারী মৃত্যুর কথা অধিক পরিমাণে স্মরণ করো’ (তিরমিযি)
আল্লাহ বলেন,    “(হে রসূল) তাদেরকে বলে দিন, পার্থিব ফায়দা সীমিত। আর আখেরাত পরহেযগারদের জন্য উত্তম। আর তোমাদের অধিকার একটি সূতা পরিমান ও খর্ব করা হবে না।  তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু কিন্তু তোমাদেরকে পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও”। [সূরা নিসা ৭৭-৭৮]
.
(৬)ষষ্টত: উপরোক্ত দুটি সমস্যার সমাধান, এমন কি মুসলিম উম্মাহর সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে রাসুল (সা.)-এর একটি হাদিসের মধ্যে।
তিনি বলেছেন :
‘যখন মানুষ দিনার এবং দিরহামের মধ্যে ডুবে যাবে, এবং যখন ঈনা নামক (সুদী) ব্যবসায় জড়িত হয়ে যাবে, আর গরুর লেজ-এ সন্তুষ্ট হয়ে যাবে এবং জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ছেড়ে দিবে, আল্লাহ তাদের উপর লাঞ্চনা চাপিয়ে দিবেন, তিনি তা উঠিয়ে নিবেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের দ্বীনে ফিরত না যাবে।’
[হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ (২/২৮), তাবরানী (১২/৪৩৩), বায়হাকী (শুয়াবুল ঈমান ৭/৪৩৪), আবু ইয়ালা (১০/২৯)]
তাই আমাদের সমস্যা কোন টাকা-পয়সার, প্রযুক্তি, ব্যবসা এর কমতি নয়, গরুর লেজ অর্থাৎ কৃষিকাজ-এর কমতি নয়, যা অনেক তথাকথিত ইসলামী বুদ্ধিজীবীরা মনে করে থাকেন। বরং আমাদের সমস্যা অন্য কোথাও। আমাদের লাঞ্চনার কারণ জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ছেড়ে দেয়া, ক্বিতাল করতে গিয়ে আল্লাহর রাস্তায় মৃত্যুকে ভয় করা আর দুনিয়ার জীবনকে আখিরাত থেকে বেশী ভালোবাসা।
যখন মুসলিমরা অনুধাবন করবে যে, মৃত্যু আসলে সমাপ্তি নয়, বরং নতুন জীবনের শুরুমাত্র, আর আখিরাতের জীবনই প্রকৃত জীবন তখন এই উম্মাহর অবস্থা নিশ্চিতভাবেই বদলাতে শুরু করবে ।
এর আগ পর্যন্ত আল্লাহ বলছেন: “আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।”[আর রাদ ১১]

[Taken from www.IISCA.org]