ইবাদত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইবাদত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ মার্চ, ২০১৭

মহান আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা ও তাঁকে ভালোবাসা-২

[রিয়াদুস সালেহীন, দ্বিতীয় খণ্ড, হাদীস নং ৪৫২-৪৫৬]
৪৫২ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তিকালের পর একদা হযরত আবু বকর(রা) হযরত উমর (রা) কে বললেন, চলো, আমরা উম্মে আয়মানকে দেখে আসি, যেমন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে দেখতে যেতেন। অতঃপর তাঁরা যখন তাঁর কাছে পৌছলেন, তিনি কেঁদে ফেললেন।তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? আপনি কি জানেন না যে, মহান আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত মঙ্গলময় পরিবেশে ও কুশলেই আছেন? তিনি বললেন, আমি কাঁদছি এ জন্য যে, আসমান থেকে ওহী আসা যে বন্ধ হয়ে গেলো! এ কথায় তাদের অন্তর প্রভাবিত হলো এবং তাঁর সাথে তাঁরাও কাঁদতে শুরু করে দিলেন। (মুসলিম)
৪৫৩ হযরত ইবন উমার(রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথাজনিত রোগ যখন তীব্র আকার ধারণ করলো, সে সময় একদা তাঁকে নামাযে আহ্বান করা হলে তিনি বললেন; আবু বকরকে আদেশ করো, সে যেন সাহাবাদের সাথে নামায পড়ে(অর্থাৎ ইমাম হয়ে নামায পড়ায়) হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তো অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ, যখন তিনি কুরআন তিলাওয়াত করবেন, তখন ক্রন্দন তার উপর প্রভাব বিস্তার করে। অতঃপর আবার তিনি বললেন; তাকে আদেশ কর সে যেন নামায পড়ায়।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা অপর এক বর্ণনায় আছে, তিনি (আয়েশা) বলেন, আমি বললাম, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন আপনার জায়গায় দাঁড়াবেন কান্নার কারণে মুসল্লিদের (কুরআন) শুনতে পারবেন না। (বুখারি ও মুসলিম)
৪৫৪ হযরত ইবরাহীম ইবন আবদুর রহমন ইবন আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। একদা আবদুর রহমান ইবন আউফের সামনে খাবার পেশ করা হলো, তখন তিনি ছিলেন রোযাদার। তিনি বললেন, মুস’আব ইবন উমায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু শহীদ হয়ে গেছেন। আর তিনি আমার চাইতে উত্তম লোক ছিলেন। তাঁকে কাফন দেয়ার মতো কাপড়ের ব্যবস্থাই ছিল না। তবে একটি চাদর ছিল, এ দ্বারা তাঁর মাথা ঢাকতে চাইলে তাঁর পা দুটি অনাবৃত হয়ে যেত, আর পা ঢাকতে চাইলে মাথা অনাবৃত হয়ে যেতো। অতঃপর আমাদের পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ দেয়া হলো। ভয় হচ্ছে, আমাদের সৎকাজের বিনিময়ে ইহকালের কখনো দস্তরখানে (খানার স্থানে) বসে খাদ্য গ্রহণ করেননি, আর কখনো চাপাতি রুটিও খাননি। (বুখারী)
৪৫৫ হযরত আবু উমাম সুদাই ইবন আজলান আল-বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহর কাছে দুটি বিন্দু (ফোঁটা) দুটি নিদর্শনের চাইতে প্রিয় বস্তু আর কিছু নেই। তার একটি হলো আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুবিন্দু এবং অপরটি হলো; আল্লাহর পথে প্রবাহিত রক্তবিন্দু। আর নিদর্শন দুটি হলো, আল্লাহর পথে জিহাদ করা এবং আল্লাহর ফরযসমূহের মধ্য থেকে কোন ফরয আদায় করা। (তিরমিযী)
৪৫৬ হযরত ইরবাদ ইবন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সামনে এমন এক উপদেশপূর্ণ খুতবা দেন যাতে আমাদের অন্তর ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। (আবু দাউদ ও তিরমিযি)

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

জিনের জগৎ

কিছু লোক জিন এর বাস্তবতা অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে। জিনের সম্বন্ধে কোরআনে একটি সম্পুর্ণ সূরা,সূরা আল্-জিন (৭২নং সূরা) অবর্তীর্ণ হয়েছে।
ক্রিয়াপদ জান্না,ইয়াজুন্নুঃ – যে গুলির অর্থ অন্তরালে রাখা,আত্মগোপন করা অথবা ছদ্মবেশে পরানো ইত্যাদি হতে প্রাপ্ত জিন শব্দের আক্ষরিক অর্থের উপর নির্ভর করে তারা দাবি করে যে জিন হচ্ছে আসলে “চতুর বিদেশী”। অন্যেরা এমনও দাবী করে যে,যাদের মগজে কোন মন নেই এবং স্বভাবে অগ্নি প্রকৃতির তারাই জিন। প্রকৃতপক্ষে জিন আল্লাহর অপর একটি সৃষ্টি যারা এই পৃথিবীতে মানুষের সঙ্গে সহ-অবস্থান করে। আল্লাহ মানবজাতি সৃষ্টির পূর্বে জিন সৃষ্টি করেন এবং তিনি মানুষ সৃষ্টির উপাদান হতে ভিন্নতর উপদানের সমষ্টি দিয়ে জিন সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ বলেনঃ


“আমি তো মানুষ সৃষ্টি করিয়াছি ছাঁচে-ঢালা শুষ্ক ঠনঠনে মৃত্তিকা হইতে। এবং ইহার পূর্বে সৃষ্টি করিয়াছি জিন অত্যুষ্ণ বায়ুর উত্তাপ হইতে।” [সূরা আল্-হিজর ১৫:২৬,২৭]
তাদের জিন নামকরণ করা হয়েছে কারণ তারা মানব জাতির চোখের অন্তরালে রয়েছে। ইবলিশ (শয়তান) জিন জগতের,যদিও আল্লাহ যখন আদমকে সিজদা করার হুকুম দিয়েছিলেন তখন সে ফেরেশতাদের মধ্যে অবস্থান করছিল। যখন সে সিজদাহ করতে অসম্মত হল এবং তাকে তার অবাধ্যতার কারণ জিজ্ঞেস করা হল। যে সম্পর্কে আল্লাহ বলেনঃ


”সে বললঃ আমি তার চেয়ে উত্তম আপনি আমাকে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।” [সূরা সাদ ৩৮:৭৬]
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা দেন যে রাসূল (সঃ) বলেছেন,


“ফেরেশতাদের আলো হতে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং জিনদের ধুম্রবিহীনঅগ্নি হতে।” [মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত Sahih Muslim, enlgish trans, vol. 4 p.1540 , no. 7134]
আল্লাহ আরও বলেনঃ


“এবং স্মরণ কর,আমি যখন ফেরেশতাগণকে বলিয়াছিলাম আদমের প্রতি সিজদা কর,তখন সকলেই সিজদা করিল ইবলীস ব্যতীত,সে জিনদিগের একজন।” [সূরা আল্-কাহ্ফ ১৮:৫০]
সুতরাং তাকে প্রত্যাখ্যাত ফেরেশতা অথবা ফেরেশতাদের একজন মনে করা ভুল হবে।
জিনদের অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণতঃ তাদেরকে
তিন শ্রেণীর ভাগ করা যেতে পারে ।
রাসুল (সঃ) বলেন,


“তিন রকম জিন আছেঃ এক রকম যারা সারাক্ষণ আকাশে উড়ে,
অন্য আর এক রকম যারা সাপ এবং কুকুর হিসাবে বিদ্যমান এবং পৃথিবীর উপর বসবাসকারী
আর এক রকম যারা একস্থানে বাস করে অথবা উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়।” [আত্ তাবারী এবং আল্-হাকিম কর্তৃক সংগৃহিত]
বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে জিনদের আবার
দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়ঃ
মুসলিম (বিশ্বাসীগণ) এবং কাফির (অবিশ্বাসীগণ)।
আল্লাহ সূরা আল-জিন এ বিশ্বাসী জিনদের সম্বন্ধে বলেনঃ


“বল,আমার প্রতি প্রেরিত হইয়াছে যে,জিনদিগের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করিয়াছে এবং বলিয়াছে,আমারাতো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবন করিয়াছি। যাহা সঠিক পথ -নির্দেশ করে;ফলে আমরা ইহাতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি। আমরা কখনও আমাদিগের প্রতিপালকের কোন শরীক স্থির করিব না এবং নিশ্চয়ই সমুচ্চ আমাদিগের প্রতিপালকের মর্যাদা, তিনি গ্রহণ করেন নাই কোন পত্মী এবং না কোন সন্তান। এবং যে আমাদিগের মধ্যকার নির্বোধরা আল্লাহর সম্বন্ধে অতি অবাস্তব উক্তি করিত।” [সুরা আল্-জিন ৭২:১-৪]


“আমাদিগের কতক আত্মসমর্পণকারী এবং কতক সীমালংঘনকারী;যাহারা আত্মসমর্পণ করে তাহারা সুচিন্তিতভাবে সত্য পথ বাছিয়ে লয়। অপরপক্ষে,সীমালংঘনকারী তো জাহান্নামেরই ইন্ধন।” [সুরা আল্-জিন ৭২:১৪-১৫]
জিনদের মধ্যে অবিশ্বাসীদের বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়ঃ
ইফরিত্, শয়তান, ক্বারিন, অপদেবতা, অশুভ আত্মা, আত্মা, ভুতপ্রেত ইত্যাদি। তারা বিভিন্নভাবে মানুষকে ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করে। যারাই তাদের কথা শুনে এবং তাদের জন্য কাজ করে তাদেরকেই মানব শয়তান বলে উল্লেখ করা হয়।
আল্লাহ বলেছেনঃ


“এইরূপে মানব ও জিনের মধ্যে শয়তানদিগকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করিয়াছি।” [সুরা-আল্-আন্’আম ৬:১১২]
প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে স্বতন্ত্র একজন করে জিন রয়েছে যাকে ক্বারিন (সঙ্গী) বলা হয়। এটা মানুষের এই জীবনের পরীক্ষার অংশ বিশেষ। জিনটি তাকে সর্বদা অবমাননাকর কামনা-বাসনায় উৎসাহিত করে এবং সার্বক্ষণিকভাবে তাকে ন্যায়-নিষ্ঠা হতে অন্য দিকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করে।
রাসুল (সঃ) এই সম্পর্ককে এভাবে বর্ণনা দিয়েছেন,


“তোমাদের প্রত্যেককে জিনদের মধ্য হতে একজন সঙ্গী দেয়া হয়েছে।” সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “এমনকি আপনাকেও ইয়া আল্লাহর রাসুল (সঃ)? তিনি বলেনঃ এখন সে আমাকে শুধু ভাল করতে বলে।” [মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত Sahih MusliM, enlgishtrans, vol. 4 p.1540 , no. 7134]


“সুলায়মানের সম্মুখে সমবেত করা হইল তাহার বাহিনীকে-জিন,মানুষ ও বিহংগকুলকে এবং উহাদিগকে বিন্যস্ত করা হইল বিভিন্ন ব্যূহে।” [সুরা আন-নামল ২৭:১৭]
কিন্তু অন্য কাউকে এই ক্ষমতা প্রদান করা হয় নাই। অন্য কাউকে জিন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেয়া হয়নি এবং কেউ পারেও না। রাসুল (সঃ) বলেছেন,


“যথার্থই গত রাতে জিনদের মধ্যে হতে একজন ইফরিত (একটি বলিষ্ঠ অথবা খারাপ জিন)” আমার সালাত ভেঙ্গে দেবার জন্য থু থু নিক্ষেপ করেছিল। যাহোক আল্লাহ তাকে পরাভূত করতে আমাকে সাহায্য করেন এবং যাতে তোমরা সকালে তাকে দেখতে পারো সে জন্য তাকে আমি মসজিদের একটি স্তম্ভের সঙ্গে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলাম। অতঃপর আমার ভ্রাতা সোলাইমানের দোয়া মনে পড়লঃ “হে আমার রব, আমাকে ক্ষমা কর এবং আমাকে দান কর এমন এক রাজ্য যাহার অধিকারী আমি ছাড়া কেহ না হয়।” [সুরা সাদ ৩৮:৩৫]
মানুষ জিনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম নয় কারণ এই বিশেষ অলৌকিক ক্ষমতা শুধু পয়গম্বর সোলায়মানকে দেয়া হয়েছিল।প্রকৃতপক্ষে, আছর অথবা ঘটনাক্রম ছাড়া জিনদের সাথে যোগাযোগ হওয়া বেশীর ভাগ সময়ই নিষিদ্ধ বা ধর্মদ্রোহী কাজের মাধ্যমেই হয়। [আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস্ এর Ibn taymeeyah`s Essay on the Jinn:: রিয়াদ তৌহিদ প্রকাশনী,১৯৮৯,পৃ.২১]
এভাবে তলব করে আনা দুষ্ট জিন তাদের সঙ্গীদের গুনাহ করতে এবং স্রষ্টাকে অবিশ্বাস করতে সাহায্য করতে পারে। তাদের লক্ষ্য হল স্রষ্টা ছাড়া অথবা স্রষ্টার পাশাপাশি অন্যকে উপাসনা করার মত গুরুতর গুনাহ করতে যত বেশী জনকে পারা যায় তত জনকে আকৃষ্ট করে। একবার গণকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চুক্তি হয়ে গেলে, জিন ভবিষ্যতের সামান্য কিছ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জানাতে পারে।
রাসুল (সাঃ) বর্ণনা দিয়েছেন জিনরা কিভাবে ভবিষ্যত সম্বন্ধে সংবাদ সংগ্রহ করে। তিনি বর্ণনা দেন যে,


জিনরা প্রথম আসমানের উপর অংশ পর্যন্ত ভ্রমণ করত এবং ভবিষ্যতের উপর কিছু তথ্যাদি যা ফিরিশতারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করত তা শুনতে সক্ষম হত। তারপর তারা পৃথিবীতে ফিরে এসে তাদের পরিচিত মানুষের কাছে ঐ তথ্যগুলি পরিবেশন করত।আল্-বুখারী এবং মুসলিম কতৃর্ ক সংগৃহীত। [ Sahih Muslim, Englishtrans, vol.4, p.1210, no, 5538]
মুহাম্মদ (সাঃ) এর নবুওত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত এই ধরণের বহু ঘটনা সংঘটিত হত। এবং গণকরা তাদের তথ্য প্রদানে নির্ভূল ছিল। তারা রাজকীয় আদালতে আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল এবং প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।এমনকি পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে তাদের পুজাও করা হত।
রাসুল (সাঃ) কর্তৃক ধর্ম প্রচার শুরু করার পর হতে অবস্থার পরিবর্তন হয়। আল্লাহ ফিরিশতাদের দিয়ে আসমানের নীচের এলাকা সতর্কতার সঙ্গে পাহাড়া দেবার ব্যবস্থা করলেন। তারপর হতে বেশীরভাগ জিনদের উল্কা এবং ধাবমান নক্ষত্ররাজি দিয়ে তাড়িয়ে দেয়া হত। আল্লাহ এই বিস্ময়কর ঘটনা কোরআনের ভাষায় বর্ণনা করেছ্নেঃ


“এবং আমরা চাহিয়াছিলাম আকাশের তথ্য সংগ্রহ করিতে কিন্তু আমরা দেখিতে পাইলাম কঠোর প্রহরী ও উল্কা পিন্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ ;আর পূর্বে আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাটিতে সংবাদ শুনিবার জন্য বসিতাম কিন্ত এখন কেহ সংবাদ শুনিতে চাহিলে সে তাহার উপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জলন্ত উল্কা পিন্ডের সম্মুখীন হয়।” [সূরা আল-জ্বিন ৭২:৮-৯]
আল্লাহ আরও বলেনঃ


“প্রত্যেক অভিশপ্ত শয়তান হইতে আমি উহাকে রক্ষা করিয়া থাকি; আর কেহ চুরি করিয়া সংবাদ শুনিতে চাহিলে উহার পশ্চাদ্ধাবন করে প্রদীপ্ত শিখা।” [সূরা আল হিজর ১৫:১৭-১৮]
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,


“যখন রাসুল (সাঃ) এবং তাঁর একদল সাহাবা উকাধ বাজারের দিকে রওয়ানা হলেন, তখন শয়তানদের ঐশী খবরাখবর শোনায় বাধা প্রদান করা হল। উল্কাপিন্ড তাদের উপর ছেড়ে দেয়া হল। ফলে তারা তাদের লোকদের কাছে ফিরে এল। যখন তাদের লোকরা জিজ্ঞাসা করল কি হয়েছিল, তারা তাদের জানালো। কেউ কেউ পরামর্শ দিল যে নিশ্চয়ই কিছু ঘটেছে, কাজেই তারা কারণ খুজে বের করার জন্য পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের কয়েকজন রাসুল (সাঃ) এবং তাঁর সাহাবাগণের সালাত রত অবস্থা দেখতে পেল এবং তারা তাদের কোরআন পড়া শুনলো। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল যে নিশ্চয় এটাই তাদের শোনায় বাধা প্রদান করেছিল। যখন তারা তাদের লোকদের মধ্যে ফিরে গেল তখন তারা বলল, “আমরা তো এক বিস্ময়কর কোরআন শ্রবণ করিয়াছি। যাহা সঠিক পথ নির্দেশ করে, ফলে আমরা ইহাতে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছি। আমরা কখনও আমাদিগের প্রতিপালকের কোন শরীক স্থির করিব না।” [সুরা আল জিন ৭২:১-২] [ আল্-বুখারী, মুসলিম, আত্ তিরমিজী এবং আহমদ কর্তৃক সংগৃহীত।Sahih Al-Bukhari, Arabic-English, vol.6, pp.415-6.no.443 and Sahih Muslim, English trans, vol.1, pp.243-44, no, 908]
এইভাবে রাসূল (সাঃ) কর্তৃক ধর্ম প্রচারের পূর্বে জিনরা যেভাবে সহজে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে খবরাখবর সংগ্রহ করত তা আর আর পারেনি। ঐ কারণে তারা এখন তাদের খবরাখবরের সঙ্গে অনেক মিথ্যা মিশ্রিত করে।
রাসুল (সাঃ) বলেন,


“জাদুকর অথবা গনকের মুখে না পৌছান পর্যন্ত তারা (জিনরা) খবরাখবর নীচে ফেরত পাঠাতে থাকবে। কখনও কখনও তারা খবর চালান করার আগেই একটি উল্কা পিন্ড তাদের আঘাত প্রাপ্ত করার পূর্বে পাঠাতে পারলে এর সঙ্গে তারা একশটা মিথ্যা যোগ করবে। [আল্-বুখারী, মুসলিম এবং আত্ তিরমিজী কর্তৃক সংগৃহীত। Sahih Al-Bukhari, Arabic-English, vol.8, p.150 , no.232]
আয়শা (রাঃ) তখন উল্লেখ করলেন যে গণকরা কখনও কখনও যা বলে সত্য হয়।
রাসুল (সঃ) বলেন,


‘‘ওতে সত্যতার কিছু অংশ যা জিনরা চুরি করে এবং তার বন্ধুর কাছে বলে কিন্তু সে এর সাথে একশটি মিথ্যা যোগ করে। ”আয়েশা বর্ণনা দেন যে তিনি আল্লাহর রাসূলের (সঃ) কাছে গণকদের সম্বন্ধে জিজ্ঞসা করলে তিনি উত্তর দেন যে ওরা কিছু না। [আল্-বুখারী এবং মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত। Sahih Al-Bukhari, Arabic-English, vol.1, p.439.no.657 and Sahih Muslim, English trans, vol.4, p.1209, no, 5535]
একদিন উমর ইবনে আল খাত্তাব যখন বসে ছিলেন তখন একটি সুদর্শণ লোক তার পাশ দিয়ে চলে গেলে তিনি বললেন, আমার যদি ভূল না হয় লোকটি এখনও প্রাক ইসলামি ধর্ম অনুসরণ করছে অথবা বোধ হয় সে তাদের একজন গণক। তিনি লোকটি কে তার সামনে আনতে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি তার অনুমান সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলেন। লোকটি উত্তর দিল, আমি আজকের মত আর কোন দিন দেখিনি যেদিন মুসলিম এই ধরণের অভিযোগের সম্মূখীন হয়েছে। উমর (রাঃ) বললেন,অবশ্যই আমাকে তামার অবহিত করা উচিত। লোকটি তখন বলল, অজ্ঞতার যুগে আমি তাদের গণক ছিলাম। ঐ কথা শুনে উমর জিজ্ঞাসা করলেন,তোমার মহিলা জিন তোমাকে সব চেয়ে বিস্ময়কর কি বলেছে। লোকটি তখন বলল,একদিন আমি যখন বাজারে ছিলাম,সে (মহিলা জিন) উদ্বিগ্ন হয়ে আমার কাছে এসেছিল এবং বলেছিল মর্যাদাহানি হবার পর তুমি কি জিনদের হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় দেখনি? তুমি কি দেখনি তাদেরকে (জিনদেরকে) মাদী উট ও তাতে আরোহণকারীদের অনুসরণ করতে? উমর বাধাদান পূর্বক বললেন,এটা সত্য।
[আল্-বুখারী কর্তৃক সংগৃহীত। Sahih Al-Bukhari, Arabic-English, vol.5, p.131-2. no.206]
জিনরা তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষাকারী মানুষকে আপতঃ ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে অবহিত করতে সক্ষম।
উদাহরণস্বরূপ,যখন কেউ একজন গণকের কাছে আসে সে আসার আগে কি কি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল তা গণকের জিন আগত লোকটির ক্বারিনের (প্রত্যেক মানুষের সঙ্গে নিয়োজিত জিন) কাছ থেকে জিন জেনে নেয়। সুতরাং গণক লোকটিকে বলতে সক্ষম হয় যে সে এটা করবে অথবা অমুক অমুক জায়গায় যাবে। এই প্রক্রিয়ায় একজন সতিকার গণক অপরিচিত লোকের অতীত পরির্পূণ ভাবে জানতে সক্ষম হয়। সে একজন অচেনা ব্যক্তির পিতামার নাম, কোথায় জন্ম গ্রহণ করেছিল এবং তার ছেলে বেলার আচারণ ইত্যাদি সম্বন্ধে বলেতে সক্ষম হয়। অতীত সম্বন্ধে পরিপূর্ণ বর্ণনা দেবার ক্ষমতা জিন এর সঙ্গে মুহুর্তের মধ্যে বহু দুরত্ব অতিক্রম করতে এবং গোপন বিষয় হারানো জিনিস, অদেখা ঘটনা বলি সম্বন্ধে বহু তথ্যাদি সংগ্রহ করতেও সক্ষম।
কোরআনে বর্ণিত পয়গম্বর সুলায়মান এবং সিবার রাণী বিলকিসের গল্পে মধ্যে এই ক্ষমতার সত্যতা পাওয়া যায়।


যখন রাণী বিলকিসের গল্পে এলেন,তিনি একটি জিনকে রাণীর দেশ থেকে তার সিংহাসন নিয়ে আসতে বললেন। “এক শক্তিশালী জিন বলল,আপনি আপনার স্থান হইতে উঠিবার পূর্বে আমি উহা আনিয়া দিব এবং এই ব্যাপারে আমি অবশ্যই ক্ষমতাবান বিশ্বস্ত। [সূরা আন নামল, ২৭:৩৯]

মিলাদ সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর ৩- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন, এমন ধারণা পোষণকারী ব্যক্তিকে কিভাবে প্রতিবাদ করব

লেখকঃ শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
প্রশ্ন : পাকিস্তানে কতক সূফী রয়েছে, এরা মূলত সকল অনিষ্টের মূল, আমি তাদের এক আলেম নামধারী ব্যক্তিকে বলতে শোনে হতবাক হয়ে গেছি, সে বলে : তোমরা বাস্তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাত লাভ করতে পার ? তার উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সশরীরে জীবিত এসে তার ওলীদের সাথে সাক্ষাত করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন তারা শুধু এটা অবিশ্বাসই করে না, বরং তারা বলে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্তমানেও তার ওলীদের সাথে জীবিত সশরীরে এসে সাক্ষাত করেন। আমরা তাদেরকে কিভাবে প্রতিবাদ করব ? ইসলামী শরী’আতে এর হুকুম কী ?
উত্তর : আল-হামদুলিল্লাহ, বিদ‘আত প্রতিরোধ করা অথবা কারো ভুল সংশোধন করার উত্তম পন্থা হচ্ছে তার কাছে দলিল সম্পর্কে জানতে চাওয়া। যার কথা বা দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে দলিল চাওয়া হয়, সে অবশ্যই নিজের বিষয়টি গভীর মনোযোগ ও বিবেক দিয়ে যাচাই করে, সঠিক দলিল ও নির্ভুল নিয়ম অনুসরণ করে, ধারণা বা শ্রুত কোন ঘটনার ভিত্তিতে নয়। এ প্রসঙ্গে সকলে একমত যে, এ বিষয়গুলো দ্বীনি ও ধর্মীয়, অতএব এসব বিষয়ে সকলের কর্তব্য দলিল উপস্থাপন করা এবং দলিলের ভিত্তিতে এসব গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা।

এরা জাগ্রত অবস্থায় সরাসরি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার দাবি করে :
তারা হয়তো বলে : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রূহসহ সশরীরে জীবিত, যেখানে ইচ্ছা যাওয়া-আসা এবং যেরূপ ইচ্ছা নড়াচড়া করেন, যেমন ছিলেন তিনি জীবিত অবস্থায়, অনুরূপ এখনো। অথবা তারা বলে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন, অর্থাৎ তিনি তার বারযাখি জগত তথা কবরের বিশেষ হায়াতে চলে গেছেন, যে হায়াত একমাত্র তার সাথেই খাস, যদি কেউ তাকে দেখে, মূলত তার সামনে তার আকৃতি ভেসে উঠে সেখান থেকেই।
উভয় অবস্থায় তারা দলিল পেশ করতে বাধ্য, কুরআন অথবা সুন্নত অথবা উম্মতের ইজমা থেকে। তারা যেসব দলিল বর্ণনা করে, তা আমরা খতিয়ে দেখেছি, যার সারাংশ কতক ওলী ও নেককার লোকের ঘটনা এবং তাদের উল্লেখ করা প্রত্যক্ষদর্শী কতক লোকের নাম। সন্দেহ নেই, এসব ঘটনা দলিল হিসেবে পেশ করার উপযুক্ত নয়। দলিল হয়তো কুরআনের আয়াত অথবা হাদিস অথবা উম্মতের ইজমা অথবা ন্যূনতম পক্ষে কোন সাহাবির বাণী হবে, কিসসা বা ঘটনা নয়। বিশেষ করে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিত্ব ও ইলমে গায়েবের সাথে তার সম্পৃক্ততার বিষয় হয়।
তাদের বর্ণিত এসব কিসসা-কাহিনীর ব্যাপারে আমি বলতে চাই, এতে নানা সম্ভাবনা বিদ্যমান : হয়তো এসব ঘটনা কখনোই সংঘটিত হয়নি, তারা শুধু নিজেদের কল্পনা প্রকাশ করেছে, অথবা এসব ঘটেছে তাদের স্বপ্নে দিবালোকে নয়, এমনও হতে পারে শয়তান নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতির ধান্ধা দিয়েছে, অথবা এগুলো ছিল তাদের চিন্তার ভেলকিবাজি, যা তারা বাস্তব ধরে নিয়েছে।
আর আমরা যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাস্তবে দেখার বিপক্ষে দলিল পেশ করতে সক্ষম হই, -ধ্যানে বা খেয়ালে দেখার বিপক্ষে নয়, তাহলে এসব সম্ভাবনাই জোরদার হয়, বলার অপেক্ষা রাখে না।  আবু বকর সিদ্দীক -রাদিআল্লাহু আনহু- বলেন : “জেন রেখ, যে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইবাদাত করত, নিশ্চয় মুহাম্মদ মারা গেছেন, আর যে আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত করত, আল্লাহ চিরঞ্জীব তিনি কখনো মারা যাবেন না”।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ
‘নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল’। [সূরা যুমার : ৩০]
সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يَنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللَّهَ شَيْئاً وَسَيَجْزِي اللَّهُ الشَّاكِرِينَ
‘আর মুহাম্মদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ? আর যে ব্যক্তি পেছনে ফিরে যায়, সে কখনো আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবেন’। [সূরা আলে-ইমরান : ১৪৪] [বুখারী : ৩৬৬৭]
সাহাবায়ে কেরাম, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি নিকটবর্তী ছিলেন, তাকে অধিক মহব্বত করতেন এবং তার আনুগত্যে নিজেদের উৎসর্গ করে দিতেন, তারা যদি মৃত্যুর অর্থ অনুধাবন করতে পারেন, অর্থাৎ তার সাথে দুনিয়াতে আর কখনো সাক্ষাৎ সম্ভব নয় জানেন, তাহলে এরা কিভাবে ধারণা করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তাদের সাথে উঠাবসা করে ?!
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “এসব ক্ষেত্রে তাদের কিছু শয়তানি ধান্ধা ও আসর হাসিল হয়, যা তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে কারামত মনে করে। তাদের কেউ দেখে যে, কবরস্থ ব্যক্তি তার কাছে এসেছে, -অথচ বহু বছর পূর্বে সে মারা গছে- এবং বলছে : আমি অমুক। অনেক সময় তাকে বলে : আমরা এমন লোক, আমাদেরকে যখন কবরে রাখা হয় আমরা উঠে আসি। এমনি ঘটনা ঘটেছে তুনসি ও নুমান সালামির সাথে। আর শয়তান তো অহরহ মানুষের আকৃতি ধারণ করে, তাদেরকে ঘুমন্ত ও ও সজাগ উভয় অবস্থায় ধোঁকা দেয় ও প্রতারিত করে।
অনেক সময় অপরিচিত লোকের নিকট এসে বলে : আমি অমুক বুযুর্গ অথবা আমি অমুক আলেম। অনেক সময় তাদেরকে বলে : আমি আবু বকর, আমি ওমর। আবার অনেক সময় জাগ্রত অবস্থায় এসে বলে : আমি মাসীহ, আমি মূসা, আমি মুহাম্মদ।
এ জাতীয় আরও অনেক ঘটনা আমি জানি, আর এ থেকে অনেকে বিশ্বাস করে নেয় যে, নবীগণ নিজ আকৃতিতে জাগ্রত অবস্থায় তাদের সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন।
এদের কতক শায়খ আছেন, যাদের মুজাহাদা, ইলম, তাকওয়া ও দ্বীনদারী প্রসিদ্ধ, তারা সরল মনে এসব ঘটনা বিশ্বাস করে নেয়।
এদের মধ্যে কতক রয়েছে, যে ধারণা করে, যখন সে নবীর কবর যিয়ারত করতে আসে, তখন তিনি সশরীরে কবর থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেন। এদের কেউ কাবার সীমানায় জনৈক শায়খের চেহারা দেখে বলে : তিনি ইবরাহিম খলিল। এদের কেউ ধারণা করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হুজরা থেকে বের হয়ে তার সাথে কথা বলেছেন। এটা সে নিজের কারামাত মনে করে। এদের কারো বিশ্বাস : কবরস্থ ব্যক্তিকে আহ্বান করলে সে ডাকে সাড়া দেয়।  এদের কেউ বর্ণনা করত : ইব্‌ন মুনদাহ কোন হাদিস সম্পর্কে সমস্যায় পড়লে, হুজরায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করত, আর তিনি তার উত্তর দিতেন। সর্বশেষ এমন ঘটনা মরক্কোর এক ব্যক্তির ঘটে, অতঃপর সে এ ঘটনাকে নিজের কারামাত গণ্য করে।
এসব ধারণা পোষণকারী সম্পর্কে ইব্‌ন আব্দুল বারর বলেছেন : তুমি নিপাত যাও! এসব ঘটনা তুমি মুহাজির ও আনসার সম্পর্কে জান ? তাদের মধ্যে এমন কেউ ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর যে তাকে জিজ্ঞাসা করেছে, আর তিনি তার উত্তর দিয়েছেন ?
সাহাবায়ে কেরাম কত বিষয়ে মত বিরোধ করেছে, তারা কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেনি ?! এমনকি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে ফাতেমা মিরাসের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেন, তিনি কেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেননি ?” “মাজমুউল ফতোয়া” : (১০/৪০৬-৪০৭)
ইব্‌ন তাইমিয়্যাহ -রাহিমাহুল্লাহ- আরও বলেন :    “এর দ্বারা বলা উদ্দেশ্য যে, সাহাবায়ে কেরামদের গোমরাহ করার জন্য শয়তান এসব স্পষ্ট কুফরি পেশ করার সাহস করেনি, যেরূপ সাহস এসব গোমরাহ ও বিদআতিদের ক্ষেত্রে করেছে, এরা কুরআনের অপব্যাখ্যা করেছে, অথবা এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, অথবা এরা অস্বাভাবিক আশ্চর্য কিছু শ্রবণ করেছে ও দেখেছে, আর তাকেই মনে করেছে যে, এগুলো নবী ও নেককার লোকের আলামত, অথচ এগুলো ছিল শয়তানের কারসাজি। খ্রিষ্টান ও বিদ‘আতি সম্প্রদায় এভাবেই পথভ্রষ্ট হয়েছে। তারা মুতাশাবেহ আয়াতের (যার অর্থ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না) অনুসরণ করে, আর দাবি করে এগুলো মুহকাম (স্পষ্ট অর্থের ধারক), অনুরূপ তারা যুক্তি ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দলিল আঁকড়ে থাকে, অতঃপর কিছু শোনে ও দেখে বলে : এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, অথচ তা শয়তানের পক্ষ থেকে, আর তারা দাবি করে এগুলো স্পষ্ট সত্য এতে কোন অস্পষ্টতা নেই।

অনুরূপ সাহাবাদের ক্ষেত্রে শয়তান এমন সাহস করেনি, তাদের সামনে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকৃতি ধারণ করবে, অথবা তার নিকট ফরিয়াদ করবে, অথবা তাদের নিকট এমন আওয়াজ পেশ করারও সাহস দেখায়নি, যে আওয়াজ তার আওয়াজের ন্যায়, কারণ যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে, তারা নিশ্চয় জানে এসব শিরক ও হারাম।
এ জন্য শয়তান তাদের কাউকে এও বলতে সাহস করেনি : তোমাদের কারো প্রয়োজন হলে আমার কবরের নিকট আস, আমার উসিলা দিয়ে ফরিয়াদ কর, না তার জীবদ্দশায় না তার মৃত্যুর পর। পরবর্তী যুগের লোকের ক্ষেত্রে যেরূপ ঘটেছে।
শয়তান তাদের কারো নিকট এসে এও বলার সাহস করেনি : আমি অদৃশ্য ব্যক্তি, অথবা আমি চতুর্থ আওতাদের অন্তর্ভুক্ত, অথবা সপ্তম আওতাদের অন্তর্ভুক্ত, অথবা চল্লিশ আওতাদের অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপ তাদের কাউকে বলার সাহস করেনি : তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এগুলো ছিল তাদের নিকট অসার ও নিরর্থক। শয়তান তাদের কারো কাছে এসে বলার সাহস করেনি : আমি আল্লাহর রাসূল, অথবা কবর থেকে তাদের কাউকে সম্বোধন করারও সাহস করেনি, যেমন পরবর্তী যুগে অনেকের ক্ষেত্রে ঘটেছে, তার কবরের নিকট, অন্যদের কবরের নিকট, বরং যেখানে কবর নেই সেখানেও।
অনুরূপ ঘটনা মুশরিক ও কিতাবিদের ক্ষেত্রেও অনেক ঘটে, তারা দেখে মৃত্যুর পর তাদের কোন সম্মানিত ব্যক্তি এসে তাকে সম্মান করছে। যেমন হিন্দুরা তাদের শ্রদ্ধার পাত্র পুরোহিত বা অন্য কোন কাফের ব্যক্তিকে দেখে। যেমন নাসারাগণ তাদের শ্রদ্ধার পাত্র নবী, হাওয়ারী ও অন্যদের দেখে। অনুরূপ আহলে কেবলার পথভ্রষ্টরাও জাগ্রত অবস্থায় তাদের সম্মানিত ব্যক্তিদের দেখে : হয়তো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অথবা অন্য কাউকে, তারা তাকে সম্বোধন করে, সেও তাদেরকে সম্বোধন করে। কখনো তার থেকে উপকৃত হয়, তাকে কোন হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আর সে তাদেরকে উত্তর দেয়। তাদের কাউকে এমন ধারণা দেয়া হয় যে, হুজরা দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে এসেছেন, তার সাথে মু‘আনাকা করছেন তিনি এবং তার দুই সাথী। আবার তাদের কাউকে এমন ধারণা দেয়া হয় যে, তার সালাম কয়েক দিনের দূরত্বে ও অনেক দূর স্থানে পৌঁছে গেছে। এরূপ আরও অনেক ঘটনা জানি এবং যাদের সাথে ঘটেছে তাদের অনেককেই জানি। আমার নিকট এদের অনেকে এর সত্য সত্য বর্ণনা দিয়েছে, তাদের উল্লেখ করলে স্থান দীর্ঘায়িত হবে।
এরূপ ঘটনা অনেকেরই ঘটতে পারে, যেরূপ ঘটে নাসারা ও মুশরিকদের ক্ষেত্রে। তবে এদের অনেকে এ ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। আবার এদের অনেকের ক্ষেত্রে ঘটনা সত্য হলেও, তারা এটা আল্লাহর নিদর্শন মনে করে, আরও ধারণা করে এটা তার অন্তরের শুদ্ধতা ও দ্বীনদারীর কারণেই ঘটেছে, কিন্তু সে জানে না এটা শয়তানের পক্ষ থেকে, সে জানে না মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার সুযোগে শয়তান তাদেরকে গোমরাহ করে। যার একেবারেই সামান্য জ্ঞান, শয়তান তাকে শরী‘আতের স্পষ্ট খেলাফ করার নির্দেশ করে। আর যার মোটামুটি জ্ঞান রয়েছে, শয়তান তাকে তার জানা বিষয়ের মাধ্যমেই গোমরাহ করে, এটাই শয়তানের কাজ, সে যদিও মনে করে কিছু সে অর্জন করেছে, কিন্তু সে যে দ্বীন হারিয়েছে তার ক্ষতি এরচেয়ে ঢের বেশী।
  • এ জন্যই সাহাবাদের কেউ বলেনি : তার কাছে খিজির এসেছে, না মূসা, না ঈসা, আর না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উত্তর শুনেছেন।
  • ইব্‌ন ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- সফর থেকে এসেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করতেন, কিন্তু কখনো তিনি বলেননি আমি উত্তর শুনেছি। অনুরূপ তাবেঈ বা তাদেরও অনুসারী কারো ক্ষেত্রে এরূপ ঘটেনি, বরং এসব ঘটেছে তাদেরও অনেক পরে।
  • অনুরূপ সাহাবাদের কেউ তাদের ইখতিলাফি বিষয় বা ইলমী কোন সমাধানের জন্য তার কবরে যাননি, না চার খলিফা, না তাদের ব্যতীত অন্য কেউ, অথচ তাদের সাথেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্পর্ক গভীর ছিল।
  • এমনকি ফাতেমা- রাদিআল্লাহু আনহা-কে পর্যন্ত শয়তান বলার সাহস করেনি, তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে গিয়ে জিজ্ঞাসা কর, আপনার মিরাসের হুকুম কী ?
  • অনুরূপ অনাবৃষ্টির সময় শয়তান তাদেরকে এভাবে ধোঁকা দেয়ার সাহস করেনি : তার নিকট দোয়া প্রার্থনা কর, যেন তিনি বৃষ্টির জন্য দোয়া করেন। তাদেরকে এও বলেনি : তোমাদের বিজয়ের জন্য তার নিকট সাহায্যের দোয়া প্রার্থনা কর, আর না বলেছে তার নিকট ইস্তেগফার প্রার্থনা কর। তার জীবিতাবস্থায় যেরূপ তারা তার নিকট গিয়ে রোগ মুক্তির দোয়া চাইত, বিজয়ের জন্য দোয়া চাইত। তার মৃত্যুর পর শয়তান তাদেরকে এরূপ গোমরাহ করার সাহস করেনি, আর না এভাবে সাহস করেছি পরবর্তী তিন যুগে। এসব গোমরাহী তখনই সৃষ্টি হয়েছে, যখন তাওহীদ ও সুন্নতের ইলম হ্রাস পেয়েছে, তখনি তাদের গোমরাহ করার সুযোগ শয়তানের হাতে এসেছে, যেরূপ গোমরাহ করেছে নাসারাদের, যখন তাদের নিকট ঈসা ও তার পূর্ববর্তী নবীদের ইলম হ্রাস পেয়েছিল।” “মাজমুউল ফতোয়া” : (২৭/৩৯০-৩৯৩)
আল্লামা আলুসি -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন :
“কামেল লোকদের সম্পর্কে যা বলা হয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তারা তাকে দেখেছেন, তাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, তার থেকে শিখেছেন, ইসলামের প্রথম যুগে কারো ব্যাপারে এরূপ ঘটেছে আমাদের জানা নেই”।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর দ্বীনি ও দুনিয়াবি বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবাদের মাঝে ইখতিলাফ হয়েছে, তাদের মধ্যে আবু বকর ও আলী -রাদিআল্লাহু আনহুমা- ছিলেন, যেসব সূফীদের সম্পর্কে এসব ঘটনা বর্ণনা করা হয়, তাদের সিলসিলা এদের দু’জন পর্যন্ত গিয়েই শেষ হয়, অথচ কোন প্রমাণ নেই যে, তাদের কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছেন অথবা তার থেকে শিখেছেন।
অনুরূপ আমাদের কাছে এমন প্রমাণও নেই যে, কোন সমস্যার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হয়ে সাহাবাদের সমাধান দিয়েছেন।ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- থেকে প্রমাণিত, তিনি কোন বিষয়ে বলেছেন : আফসোস ! এ বিষয়ে যদি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করতাম! আমাদের নিকট এমন প্রমাণও নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ওমর -রাদিআল্লাহু আনহু- তার নিকট দু‘আর আবেদন করেছেন, যেমন কতক সূফীদের ব্যাপারে বর্ণনা করা হয়।
তুমি জান যে, তারা দাদার সাথে ভাইদের মিরাস বণ্টন সম্পর্কে ইখতিলাফ করেছে, কিন্তু তুমি কি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তার সমাধান দিয়েছেন ?! তোমার নিকট নিশ্চয় পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর ফাতেমা -রাদিআল্লাহু আনহা- কিরূপ শোকে কাতর হয়েছিল, “ফিদাক”-এর মিরাস সম্পর্কে তার অবস্থা কেমন হয়েছিল, কিন্তু তুমি কি জান, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন ও তার সমস্যা দূর করেছিলেন, যেমন সূফীদের ক্ষেত্রে ঘটে ?!
তুমি অবশ্যই জান যে, আয়েশা- রাদিআল্লাহু আনহা- বসরায় গিয়েছিলেন, যে কারণে সেখানে জামাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়, কিন্তু তুমি জান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হয়ে তাকে নিষেধ করেছেন, অথবা তাকে বিরত রেখেছেন ?! এ ধরণের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে, যা গণনা করা সম্ভব নয়।
মুদ্দাকথা : আমাদের নিকট পৌঁছেনি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কোন সাহাবি বা তার পরিবারের কোন প্রয়োজনে কবর থেকে বের হয়েছেন, অথচ তাদের এটা বেশী প্রয়োজন ছিল। মসজিদে কুবার দরজার সামনে তার বের হওয়ার যে ঘটনা কতক শি’আ বর্ণনা করে, তাই শুধুই অপবাদ ও মিথ্যাচার।
সারকথা : পূর্ববর্তী নেককার লোকদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বের না হওয়া আর পরবর্তী লোকদের জন্য বের হওয়ার যৌক্তিক কারণ দেখাতে হবে, যার দ্বারা বিবেকবান সন্তুষ্ট হতে পারে”। রুহুল মা‘আনি : (২২/৩৮-৩৯)
শায়খ ইবন বাজ -রাহিমাহুল্লাহ- বলেন : “দ্বীনের অকাট্য প্রমাণ ও শরী‘আতের দলিল দ্বারা জানা গেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক জায়গায় বিদ্যমান নয়, তার শরীর শুধু তার কবরে মদিনা মুনাওয়ারায় বিদ্যমান। আর তার রূহ রফীকে ‘আলায় জান্নাতে বিদ্যমান। এর প্রমাণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস, তিনি মৃত্যুর সময় বলেছেন : “আল্লাহুম্মা ফির-রাফিকিল ‘আলা” তিনবার বলেন, অতঃপর তিনি মারা যান”।
সাহাবায়ে কেরাম ও তার পরবর্তী সকল উম্মত এ বিষয়ে একমত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মসজিদের পাশে আয়েশার ঘরে দাফন করা হয়েছে। আজ পর্যন্ত তার শরীর সেখানেই বিদ্যমান। আর তার রূহ, অনুরূপ অন্যান্য নবী-রাসূল ও নেককার লোকদের রূহ জান্নাতে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকের স্তর ও মর্যাদায় তারতম্য রয়েছে, তাদের ইলম ও ঈমান এবং দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যের তারতম্য অনুরূপ।
কতক সূফী যেমন ধারণা করে, তিনি গায়েব জানেন এবং তাদের মীলাদ ইত্যাদিতে তিনি উপস্থিত হোন, এসব ভ্রান্ত আকীদা, এর পশ্চাতে কোন দলিল নেই, বরং কুরআন-হাদিস ও আদর্শ পূর্বসূরীদের সম্পর্কে মূর্খতাই তাদেরকে এ দিকে ধাবিত করেছে।
আল্লাহ তাদেরকে যে গোমরাহীতে লিপ্ত করেছেন, তা থেকে আমরা নিজেদের জন্য ও সকল মুসলিমের জন্য নিরাপত্তার প্রার্থনা করছি। অনুরূপ আল্লাহ তা‘আলার নিকট দোয়া করছি, তিনি আমাদেরকে সিরাতে মুস্তাকিম ও সঠিক পথে পরিচালিত করুন। নিশ্চয় তিনি শ্রবণ করেন, নিশ্চয় তিনি কবুল করেন”। (সংক্ষিপ্ত) “মাজমুউ ফতোয়া ইবন বাজ” : (৩/৩৮১-৩৮৩)

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (কালেমা তাইয়েবা) মেনে চলার শর্তাবলী


গ্রন্থনা: শাইখ আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ইবরাহীম আল কার‘আওয়ী
অনুবাদ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সম্পাদনা: ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
এক : কালেমা তাইয়েবার অর্থ জানা।
অর্থাৎ এ কালেমার দুটো অংশ রয়েছে তা পরিপূর্ণভাবে জানা।
সে দুটো অংশ হলো:
1.    কোন হক মা’বুদ নেই
2.    আল্লাহ ছাড়া (অর্থাৎ তিনিই শুধু মা’বুদ)
দুই : কালেমা তাইয়েবার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা।
অর্থাৎ সর্ব-প্রকার সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত পরিপূর্ণ বিশ্বাস থাকা।
তিন : কালেমার উপর এমন একাগ্রতা ও নিষ্ঠা রাখা, যা সর্বপ্রকার শিরকের পরিপন্থী।
চার : কালেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা, যাতে কোন প্রকার মিথ্যা বা কপটতা না থাকে।
পাঁচ : এ কালেমার প্রতি ভালবাসা পোষণ এবং কালেমার অর্থকে মনে প্রাণে মেনে নেয়া ও তাতে খুশী হওয়া।
ছয় : এই কালেমার অর্পিত দায়িত্ব সমূহ মেনে নেয়া অর্থাৎ এই কালেমা কর্তৃক আরোপিত ওয়াজিব কাজসমূহ শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য এবং তাঁরই সন্তুষ্টির নিমিত্তে সমাধা করা।
সাত : মনে-প্রাণে এই কালেমাকে গ্রহণ করা যাতে কখনো বিরোধিতা করা না হয়।
কালেমা তাইয়েবার যে সমস্ত শর্ত বর্ণিত হলো, তার সমর্থনে কোরআন ও হাদিস থেকে দলিল প্রমাণাদি:
প্রথম শর্ত: কালেমার অর্থ জানা। এর দলিল :
আল্লাহর বাণী:
“জেনে রাখুন নিশ্চয়ই আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা‘বুদ নেই।” [সূরা মুহাম্মাদ: ১৯]।
আল্লাহ আরও বলেন:
“তবে যারা হক (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু) এর সাক্ষ্য দিবে এমনভাবে যে, তারা তা জেনে শুনেই দিচ্ছে অর্থাৎ তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।” [সূরা আয-যুখরুফ: ৮৬]
এখানে জেনে শুনে সাক্ষ্য দেয়ার অর্থ হলো তারা মুখে যা উচ্চারণ করছে তাদের অন্তর তা সম্যকভাবে জানে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : “যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা যায় যে সে জানে আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক উপাস্য নেই সে জান্নাতে যাবে।”[1]
দ্বিতীয় শর্ত : কালেমার উপর বিশ্বাসী হওয়া। এর প্রমাণাদি:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “নিশ্চয়ই মুমিন ওরাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছে, অতঃপর এতে কোন সন্দেহ-সংশয়ে পড়ে নি এবং তাদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে। তারাই তো সত্যবাদী।”[সুরা আল-হুজুরাত: ১৫]
এ আয়াতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান যথাযথভাবে হওয়ার জন্য সন্দেহ-সংশয়মুক্ত হওয়ার শর্ত আরোপ করা হয়েছে, অর্থাৎ তারা সন্দেহ করে নি। কিন্তু যে সন্দেহ করবে সে মুনাফিক, ভণ্ড (কপট বিশ্বাসী)।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ বা উপাস্য নেই, আর আমি আল্লাহর রাসূল। যে বান্দা এ দুটো বিষয়ে সন্দেহ-সংশয়মুক্ত অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”[2]
আর এক বর্ণনায় এসেছে : “কোন ব্যক্তি এ দুটি নিয়ে সন্দেহহীন অবস্থায় আল্লাহর সাক্ষাতে হাজির হবে জান্নাতে যাওয়ার পথে তার কোন বাধা থাকবে না।”[3]
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে অপর এক হাদিসের বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছিলেন: “তুমি এ বাগানের পিছনে এমন যাকেই পাও, যে মনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস এর সাথে এ-সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সঠিক মা’বুদ নেই— তাকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করবে।”[4]
তৃতীয় শর্ত : এ কালেমাকে ইখলাস বা নিষ্ঠা সহকারে স্বীকার করা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তবে জেনে রাখ দীন খালেস সহকারে বা নিষ্ঠা সহকারে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই।” [সূরা আয্‌-যুমার: ৩]
আল্লাহ আরও বলেন: “তাদেরকে এ নির্দেশই শুধু প্রদান করা হয়েছে যে, তারা নিজেদের দীনকে আল্লাহর জন্যই খালেস করে সম্পূর্ণরূপে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়ে তাঁরই ইবাদাত করবে।” [সূরা আল-বাইয়েনাহ: ৫]
হাদিস শরিফে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তিই বেশি সৌভাগ্যবান হবে যে অন্তর থেকে একনিষ্ঠভাবে বলেছে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার উপাস্য নেই।”[5]
অপর এক সহিহ হাদিসে সাহাবি উত্‌বান ইব্‌ন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া হক কোন মা’বুদ নেই বলেছে, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।”[6]
ইমাম নাসায়ি রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “দিন-রাত্রির যিক্‌র” নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মনের নিষ্ঠা সহকারে এবং মুখে সত্য জেনে নিম্নোক্ত কলেমাসমূাহ বলবে আল্লাহ সেগুলোর জন্য আকাশকে বিদীর্ণ করবেন যাতে তার দ্বারা জমিনের মাঝে কে এই কালেমাগুলি বলেছে তার প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন। আর যার দিকে আল্লাহর নজর পড়বে তার প্রার্থিত ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু তাকে দেয়া আল্লাহর দায়িত্ব। সে কালেমাগুলি হলো:
لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير
অর্থাৎ : “শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া হক কোন মা’বুদ নেই, তার কোন শরিক বা অংশীদার নেই, তার জন্যই সমস্ত রাজত্ব বা একচ্ছত্র মালিকানা, তার জন্যই সমস্ত প্রশংসা আর তিনি প্রত্যেক বস্তুর উপর ক্ষমতাবান”।[7]
চতুর্থ শর্ত : কলেমাকে মনে প্রাণে সত্য বলে জানা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আলিফ-লাম-মীম, মানুষ কি ধারণা করেছে যে, ঈমান এনেছি বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি যাতে আল্লাহর সাথে যারা সত্য বলেছে তাদেরকে স্পষ্ট করে দেন এবং যারা মিথ্যা বলেছে তাদেরকেও স্পষ্ট করে দেন।” [সূরা আল-আনকাবুত: ১-৩]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন : “মানুষের মাঝে কেউ কেউ বলে আমরা আল্লাহ এবং পরকালের উপর ঈমান এনেছি, অথচ তারা ইমানদার নয়। তারা (তাদের ধারণামতে) আল্লাহ ও ইমানদারদের সাথে প্রতারণা করছে, অথচ (তারা জানে না) তারা কেবল তাদের আত্মাকেই প্রতারিত করছে কিন্তু তারা তা বুঝতেই পারছে না। তাদের অন্তরে রয়েছে ব্যাধি, ফলে আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর মিথ্যা বলার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কষ্টদায়ক শাস্তি।” [সূরা আল-বাকারা: ৮-১০]
তেমনিভাবে হাদিস শরিফে মু‘আয ইব্‌ন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যেকোনো লোক মন থেকে সত্য জেনে এ-সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত হক কোন মা’বুদ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করেছেন।”[8]
পঞ্চম শর্ত : এ কালেমাকে মনে প্রাণে ভালবাসা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “কোনো কোনো লোক আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ ও অংশীদার গ্রহণ করে তাদেরকে আল্লাহর মত ভালবাসে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে অত্যন্ত বেশি ভালবাসে”। [সূরা আল-বাকারা: ১৬৫]
আল্লাহ আরও বলেন: “হে ইমানদারগণ তোমাদের থেকে যদি কেহ তার দীনকে পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ এমন এক গোষ্ঠীকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করে আনবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালবাসেন এবং তারাও আল্লাহকে ভালবাসেন, যারা মুমিনদের প্রতি নরম— দয়াপরবশ, কাফেরদের উপর কঠোরতা অবলম্বনকারী; তারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে, কোন নিন্দুকের নিন্দাকে ভয় করে না।” [সূরা আল মায়েদা: ৫৪]
তেমনিভাবে হাদিস শরিফে আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি বস্তুর সমাহার ঘটেছে সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে: (এক) তার কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত বা ভালবাসা অন্য সব-কিছু থেকে বেশি হবে। (দুই) কোনো লোককে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালবাসবে। (তিন) কুফরি থেকে আল্লাহ তাকে মুক্তি দেয়ার পর সে কুফরির দিকে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত অপছন্দ করবে।”[9]
ষষ্ঠ শর্ত: কালেমার হকসমূহ মনে প্রাণে মেনে নেয়া। এর দলীল:
আল্লাহর বাণী: “আর তোমরা তোমাদের প্রভুর দিকে ফিরে যাও, এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো।” [সূরা আয্‌-যুমার: ৫৪]
আল্লাহ আরও বলেন: “আর তারচেয়ে কার দীন বেশি সুন্দর যে আল্লাহর জন্য নিজেকে সমর্পণ করেছে, এমতাবস্থায় যে, সে মুহসিন”, [সূরা আন্‌-নিসা: ১২৫] মুহসিন অর্থ: নেককার, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করেছে।
আরও বলেন: “আর যে নিজেকে শুধুমাত্র আল্লাহর দিকেই নিবদ্ধ করে আত্মসমর্পণ করেছে আর সে মুহসিন”, অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত অনুযায়ী আমল করেছে, “সে মজবুত রশিকে আঁকড়ে ধরেছে” [সূরা লুকমান: ২২] অর্থাৎ: لا إله إلا الله বা আল্লাহ ছাড়া কোন হক মাবুদ নেই এ কালেমাকেই সে গ্রহণ করেছে।
আরও বলেন: “তারা যা বলছে তা নয়, তোমার প্রভুর শপথ করে বলছি, তারা কক্ষনো ইমানদার হবে না যতক্ষণ আপনাকে তাদের মধ্যকার ঝগড়ার নিষ্পত্তিকারক (বিচারক) হিসাবে না মানবে, অতঃপর আপনার বিচার-ফয়সালা গ্রহণ করে নিতে তাদের অন্তরে কোন প্রকার অভিযোগ থাকবে না এবং তারা তা সম্পূর্ণ কায়মনোবাক্যে নির্দ্বিধায় মেনে নিবে।” [সূরা আন্‌-নিসা: ৬৫]
অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের মাঝে কেউই ঐ পর্যন্ত ইমানদার হতে পারবেনা যতক্ষণ তার প্রবৃত্তি আমি যা নিয়ে এসেছি তার অনুসারী হবে।”[10] আর এটাই পূর্ণ আনুগত্য ও তার শেষ সীমা।
সপ্তম শর্ত: কালেমাকে গ্রহণ করা। এর দলীল:
আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর এমনিভাবে যখনই আপনার পূর্বে আমি কোন জনপদে ভয় প্রদর্শনকারী (রাসূল বা নবী) প্রেরণ করেছি তখনি তাদের মধ্যকার আয়েশি বিত্তশালী লোকেরা বলেছে: আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে একটি ব্যবস্থায় পেয়েছি, আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবো। (ভয় প্রদর্শনকারী) বলল: আমি যদি তোমাদের কাছে বাপ-দাদাদেরকে যার উপর পেয়েছ তার থেকে অধিক সঠিক বা বেশি হেদায়েত নিয়ে এসে থাকি তারপরও (তোমরা তোমাদের বাপ-দাদার অনুকরণ করবে)? তারা বলল: তোমরা যা নিয়ে এসেছ আমরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করছি, ফলে আমি (আল্লাহ) তাদের থেকে (এ কুফরির) প্রতিশোধ নেই, সুতরাং আপনি মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের পরিণাম-ফল কেমন হয়েছে দেখে নিন।” [সূরা আয্‌-যুখরুফ: ২৩-২৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: “নিশ্চয়ই তারা অযথা ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করত যখন তাদেরকে বলা হত যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক মা’বুদ নেই, এবং বলতো: আমরা কি পাগল কবির কথা শুনে আমাদের উপাস্য দেবতাগুলোকে ত্যাগ করবো?” [সূরা আস্‌-সাফ্‌ফাত: ৩৫-৩৭]
অনুরূপভাবে হাদিসে শরিফে আবু মুসা আশ‘আরি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান বিজ্ঞান ও হেদায়েত দিয়ে পাঠিয়েছেন তার উদাহরণ হচ্ছে এমন মুষলধারার বৃষ্টির মতো যা ভূমিতে এসে পড়েছে, ফলে এর কিছু অংশ এমন উর্বর পরিষ্কার ভূমিতে পড়েছে যে ভূমি পানি চুষে নিতে সক্ষম, ফলে তা পানি গ্রহণ করেছে এবং তা দ্বারা ফসল ও তৃণলতার উৎপত্তি হয়েছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে গর্তওয়ালা ভূমিতে (যা পানি আটকে রাখতে সক্ষম) সুতরাং তা পানি সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে আল্লাহ এর দ্বারা মানুষের উপকার করেছেন তারা তা পান করেছে, ভূমি সিক্ত করিয়েছে এবং ফসলাদি উৎপন্ন করতে পেরেছে। আবার তার কিছু অংশ পড়েছে এমন অনুর্বর সমতল ভূমিতে যাতে পানি আটকে থাকে না, ফলে তাতে পানি আটকা পড়ে নি, ফসলও হয় নি। ঠিক এটাই হলো ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে আল্লাহর দীনকে বুঝতে পেরেছে এবং আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা থেকে উপকৃত হতে পেরেছে, ফলে সে নিজে জেনেছে এবং অপরকে জানিয়েছে (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ভূমি) এবং ঐ ব্যক্তির উদাহরণ যে এই হিদায়েত এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের দিকে মাথা উঁচু করে তাকায় নি, ফলে আল্লাহ যে হিদায়েত নিয়ে আমাকে প্রেরণ করেছেন তা গ্রহণ করেনি। (তৃতীয় শ্রেণির ভূমি)।”[11]

[1] মুসলিম: (১/৫৫), হাদিস নং-২৬।
[2] মুসলিম: (১/৫৬), হাদিস নং-২৭০।
[3] মুসলিম (১/৫৬), হাদিস নং-২৭০।
[4] মুসলিম (১/৫৯)।
[5] বুখারি, হাদিস নং-৯৯।
[6] বুখারি, হাদিস নং-৪২৫; মুসলিম (১/৪৫৬), হাদিস নং- ২৬৩।
[7] নাসায়ি, আমালুল ইয়াওমে ওয়াল্লাইলা, হাদিস নং- ২৮।
[8] বুখারি, হাদিস নং-১২৮; মুসলিম: (১/৬১)।
[9] বুখারি, হাদিস নং-৪৩; মুসলিম: (১/৬৬)।
[10] হাদিসটি খতিব বাগদাদি তার তারিখে বাগদাদের ৪/৩৬৯, এবং বাগাভি তার শারহুস্‌সুন্নাহ্‌ -এর ১০৪ নং -এ বর্ণনা করেছেন। হাদিসটির সনদ শুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ আছে।
[11] সহিহ বুখারি (১/১৭৫) হাদিস নং-৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২২৮২।