গল্প সম্ভার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প সম্ভার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

…আগুনের এই তাপ তুচ্ছ…


ক্বারী মুহাম্মদ কাইয়্যাম (আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক তাঁর উপর) বর্ণনা করেছেন যে, ভারত-পাকিস্তান বিভাগের আগেই ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। তিনি বলেন,এক ধনাঢ্য ব্যক্তির অতীব রূপসী কন্যা তার এক আত্নীয়ের(খালা/ফুফু) বাড়ীতে বেড়াতে যাচ্ছিল।আত্নীয়ের বাড়ী ছিল বেশ করেক রাস্তা পরে। অর্ধেক রাস্তা যাবার পরেই সে দেখল ভয়াবহ এক দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। মেয়েটি পাশেই একটি মসজিদ দেখতে পেল এবং দ্রুত মসজিতে প্রবেশ করে মহিলাদের জায়গায় গিয়ে বসল।দাঙ্গা গভীর রাত পর্যন্ত চলেছিল এবং মেয়েটি বুঝতে পারছিল না যে সে কি করবে।
মসজিদের তত্তাবধায়ক ছিল একজন অল্পবয়স্ক যুবক ,সে যখন মসজিদ বন্ধ করতে এল তখন এই রূপসী মেয়েটিকে দেখতে পেল। সে ছিল খুবই মর্যাদা সম্পন্ন যুবক এবং তার মধ্যে আল্লাহর ভয় ছিল প্রবল,আর একারনে সে ভদ্রভাবে মেয়েটিকে  মসজিদ ছেড়ে চলে যেতে বলল।সে বলল কেউ যদি তাকে এখানে দেখে তবে তাদের দুজনের জন্যই তা কলঙ্কের এবং সমাজচ্যুতির কারণ হবে।মেয়েটি তার কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করে তাকে বলল যে,বাইরে ভীষণ দাঙ্গা চলছে, তার জন্য বাইরে বের হওয়া ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ হতে পারে।সব শুনে যুবকটি মেয়েটিকে মসজিদে থাকতে দিতে রাজি হয় এবং মসজিদের অপর প্রান্তে পড়তে বসে যায়।
মেয়েটি সারাদিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলোর কারনে ঘুমেতে পারছিলনা তাই মসজিদের অপের প্রান্ত থেক মোম জ্বালিয়ে পাঠরত ছেলেটিকে সে দেখছিল। একটা ব্যাপারে খুবই অবাক হল।কিছুক্ষণ পর পর ছেলেটি মোমের উপরে হাত ছড়িয়ে দিচ্ছিল এবং আগুনের আঁচ অসহ্য না হওয়া পর্যন্ত সরাচ্ছিল না।তারপর আবার পড়তে বসছিল।এভাবেই ভোর পর্যন্ত চলল।
এরপর ছেলেটি আযান দিল এবং মেয়েটিকে বলল যে, যেহেতু সবকিছু শান্ত হয়ে গেছে সেহেতু জামাত শুরু হবার আগেই যেন সে চলে যায়। মেয়েটি রাজী হলেও শর্ত দিল যে,সারারাত ধরে একটু পর পর ছেলেটি কেন বার বার মোমের উপর হাত দিচ্ছিল-এর কারণ তাকে বলতে হবে।ছেলেটি বলল এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যপার,কিন্তু মেয়েটি উত্তর না জেনে যেতে রাজী হল না।আমি একজন যুবক যার প্রবৃত্তির তাড়না তীব্র।আমরা একা ছিলাম এবং আমার আকাংক্ষা বেড়ে যাচ্ছিল এবং যদিও আমি পড়াশোনা করছিলাম তবুও শয়তান থেকে থেকে আমার মনে লোভ সৃষ্টি করছিল।একারনে যতবার আমার মনে এমন কিছু সৃষ্টি হচ্ছিল ততবার আমি আগুনের উপর হাত দিচ্ছিলাম এবং আমার হাত পুড়ে যাচ্ছিল।আমি নিজেকে বলছিলাম, জাহান্নামের আগুনের কাছে এই আগুনের তাপ তুচ্ছ।
মেয়েটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে বাড়িতে গেল এবং বাবা মাকে সব ঘটনা বলে তাদের দুশ্চিন্তা করল।সে তার মাকে বলল যে ,সে ঐ মসজিদের তত্তাবধায়ককে বিয়ে করতে চায়।সে ওই রাতের ঘটনা তার বাবা মাকে খুলে বলল এবং সেই সাথে এও বল যে , একমাত্র এ রকম আল্লাহ ভীরু লোকই তার স্ত্রীর কাছে সৎ থাকতে পারে।এমন মানুষ যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে সেই পারে স্ত্রীর হক পরিপুর্ণরূপে  আদায় করতে।
আর এভাবেই একজন দরিদ্র মসজিদ রক্ষক একজন সম্ভ্রান্ত পরিবারের রুপুসী কন্যাকে অর্জন করল।সে এই মর্যাদা তার চেহারার জন্য পায়নি বরং পেয়েছিল তার উত্তম চরিত্রের জন্য। সবকিছুই ধুলোয় মিশে যায় কিন্তু উত্তম চরিত্র থাকে দৃঢ। সুন্দর কাপড় চোপড় কিংবা অলংকার সম্মান আনতে পারেনা বরং একজন মানুষের মনে যা আছে তাই তার মর্যাদা নিরুপণ করে।জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে তখনই যখন তাকে কেবল পুস্তকে ধারণ না করে অন্তরেও ধারণ করা হয়।

মন ভালো করে দেয়া একটি গল্প

অনেক কাল আগের কথা। একজন দরিদ্র লোক একটি দুর্গম পাহাড়ী এলাকায় পানি বহনের কাজ করত। তার দুইটি পাত্র ছিল, একটি লাঠির দুই প্রান্তে পাত্র দুটি ঝুলিয়ে কাঁধে নিয়ে সে পানি বহন করত। রোজ অনেকটা পথ তাকে হেঁটে পাড়ি দিতে হত।
দুটি পাত্রের একটি কিছুটা ভাঙ্গা, আরেকটি ত্রুটিহীন। পানি নিয়ে যেতে যেতে ভাঙ্গা পাত্রটি প্রায় অর্ধেক খালি হয়ে যেত। অপরদিকে ত্রুটিহীন পাত্রটি প্রতিদিন সুন্দরভাবে কানায় কানায় ভরে পানি পৌছে দিত। এভাবে দরিদ্র লোকটি রোজ তার মনিবের বাড়িতে এক পাত্র আর অর্ধেক অর্থাৎ দেড় পাত্র পানি পৌছে দিত।স্বাভাবিকভাবেই, ভালো পাত্রটি তার এ কাজের জন্য খুব গর্বিত ও আনন্দিত থাকত। অপরদিকে ভাঙ্গা পাত্রটির মন খুব খারাপ থাকত। সে খুব লজ্জিত আর বিমর্ষ থাকত। কেননা তাকে যে কাজের জন্য বানানো হয়েছিল সে তার সেই কাজ পুরোপুরিভাবে করতে পারছিল না।
ত্রুটিপুর্ণ পাত্রটি এভাবে অনেকদিন পানি বহনের কাজ করার পর একদিন আর সইতে না পেরে লোকটির কাছে তার ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চাইলো। সে বলে উঠলো, “আমি আমাকে নিয়ে লজ্জিত ও হতাশ, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই”। দরিদ্র লোকটি জানতে চাইলো “কেন তুমি লজ্জা পাচ্ছো” ?
“তুমি কত কষ্ট করে রোজ আমাকে বয়ে নিয়ে যাও, নদী থেকে আমাকে পানি দিয়ে পূর্ণ করে নাও, অথচ আমি তোমার মনিবের কাছে যেতে যেতে অর্ধেক পানি ফেলে দিই, আমার এক পাশে ফাটল, ঐ ফাটল দিয়ে অর্ধেক পানি ঝরে পরে যায়”।
লোকটি তার পাত্রটির প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করলো, বলল, “মন খারাপ করো না। হয়তো এর মাঝেও ভাল কিছু আছে যা তুমি এখন বুঝতে পারছো না”।

ভাঙ্গা পাত্রটি তবু তার অপরাধবোধ আর লজ্জা থেকে মুক্তি পেল না যদিও স্বান্তনার বাণী শুনে কিছুটা শান্তি পেল। মন খারাপ করে সে প্রতিদিনের মতো আজকেও লোকটির কাঁধে চড়ে পানি বয়ে নিয়ে যেতে লাগলো, আর পথ চলতে চলতে ফাটল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরতে লাগলো, কান্নার সাথে মিলে মিশে এক হয়ে ঝরতে লাগলো। পাত্রটি পথে যেতে যেতে আশেপাশে দেখতে লাগলো, সবাই কত ভালো আছে সুখে আছে, কি চমৎকার রৌদ্রজ্জ্বল সকাল, পাহাড়ি পথের পাশে নাম না জানা কত শত ফুল ফুটে রয়েছে। সকালের রোদে, মন ভোলানো কোমল হাওয়ায় তারা হেলছে, দুলছে, খেলছে। “অথচ আমার মাঝে এত কষ্ট কেন” । পাত্রটি ভাবতে ভাবতে রোজকার মত আজও ধনী লোকটির বাড়িতে অর্ধেক পানি পৌছে দিল।
ফিরতি পথে আবারও তার ব্যর্থতার জন্য দরিদ্র লোকটির কাছে সে ক্ষমা চাইলো। তার মন খারাপ দেখে লোকটি একটু থেমে পথের পাশে ফুটে থাকা কিছু পাহাড়ি ফুল ছিঁড়ে এনে দিল তাকে। “দুঃখ করো না। আমি আগে থেকেই তোমার এ ত্রুটির কথা জানতাম, তাই যাবার বেলা প্রতিদিন তোমাকে আমার কাঁধের একই দিকে বয়ে নিয়ে যেতাম। আর যেতে যেতে তুমি তোমার ফাটল দিয়ে পানি ঝরিয়ে ঝরিয়ে যেতে, কখনো কাঁদতেও। এভাবে পথের এক পাশে তুমি প্রতিদিন পানি দিতে, দেখো পথের ঐ দিকে চেয়ে ! কত শত সুন্দর ফুল ফুটে রয়েছে ! তুমিই তো তাদেরকে পানি দিয়েছো,
অথচ পথের অপর পাশে চেয়ে দেখো! ধূলো পাথর ছাড়া কিচ্ছু নেই, কোনো ফুলও ফোটেনি”।

Moral: “regret over misdeeds erases them, and pride over good deeds ruins them ”~ Hazrat Ali (R)

কিংবদন্তী বক্সার মোহাম্মদ আলীর জীবন থেকে একটি ঘটনা, তার মেয়ের বর্ণনায়

“যদি স্মৃতি আমাকে প্রতারিত না করে, আমি একটি ছোট সাদা রঙের টপ আর কালো রঙের শর্ট স্কার্ট পরেছিলাম। আমাকে একজন মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছিল, তাই আমি কখনো বাবার সামনে এ ধরণের পোশাক পরতাম না। আমরা পৌঁছালে আমাদের গাড়ির চালক আমাদের নিয়ে গেলেন। আমি আমার আমার ছোট বোন , লায়লা, দুজনে মিলে আব্বুর হোটেল কামরায় গেলাম।
 আব্বু বরাবরের মতোই আমাদেরকে চমকে দেবার জন্য দরজার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। আব্বু আমাদের অনেক আদর করতেন, আমরা ছোট ছিলাম তখন, আমাদের কোলে করে নিয়ে আদর করতেন। আব্বু আমাকে কিছুক্ষণ দেখলেন। এরপর আমাকে কাছে টেনে বসিয়ে কিছু কথা বললেন, যা আমি কখনো ভুলব না।
আব্বু সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “হানা, আল্লাহ যা কিছু মূল্যবান করে সৃষ্টি করেছেন তা সংরক্ষণ করেছেন।
বলত, হীরে কোথায় পাওয়া যায় ? মাটির অনেক অনেক গভীরে, লুকায়িত থাকে, সংরক্ষিত থাকে।
আর মণি মুক্তো কোথায় পাও ?
একেবারে সাগর তলে , সাগরের তলদেশে, তাও একটি খোলসে ঝিনুকের মাঝে লুকানো থাকে।
সেই ঝিনুকটিও কতো সুন্দর ভেবে দেখেছো ?
আর সোনার খনিগুলো কোথায় ? মাটির কত গভীরে, পাথরের স্তরের পর স্তরে আচ্ছাদিত থাকে ঐ সোনার খনিগুলো। আর আমাদের এই মূল্যবান উপহারগুলো পাওয়ার জন্য কত না কষ্ট করতে হয় “!

কথাগুলো বলে আব্বু আমার চোখের দিকে তাকালেন, “হানা ! আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করে সৃষ্টি করেছেন মানুষ হিসেবে। তোমার দেহ পবিত্র ও একটি আমানত, তুমি আমার কাছে ঐ মণি মুক্তোগুলোর চেয়েও দামি, তোমারও নিজেকে ঢেকে রাখা উচিত আর মডেস্টি রক্ষা করা উচিত “।
Source: More Than A Hero: Muhammad Ali’s Life Lessons Through His Daughter’s Eyes.

মুসলিম বালকের হাতে খ্রিস্টান প্রশিক্ষকের ইসলামগ্রহণ

অনুবাদক: আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা : মো: আবদুল কাদের

ফিলিপাইনের জাতীয় সাঁতার দলের প্রশিক্ষক, ম্যানিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানের ওপর ডিগ্রি নেয়া ক্যাপ্টেন আব্দুল কারীম এরসিনাস নিজের ইসলাম গ্রহণের গল্প তুলে ধরেন এভাবে-
আল্লাহর অসংখ্য প্রশংসা যে, (এরসিনাস) খ্রিস্টান পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে তিনি আমাকে ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার সৌভাগ্যে ভূষিত করেছেন। আমার জন্ম ও শিক্ষা রাজধানী ম্যানিলার এক খ্রিস্টান পরিবেশে। এখানে কোনো মুসলিম নেই। ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলগুলোতেই মুসলিমদের অবস্থান সীমিত। বাল্যকালে আমার পরিবার চাইতো গির্জায় আমি বেশি বেশি সময় দেই। বাবা যখন আমাকে গির্জায় নিয়ে যাবার সুযোগ করতে পারছিলেন না, তখন আমার বয়সে বড় এক ভাই এলেন। তিনি রোজ আমাকে গির্জায় নিয়ে যেতেন।
আমি যখন যৌবনে পা রাখলাম, গির্জায় যেতে কোনো আগ্রহ বোধ করছিলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর নিজ ধর্ম খ্রিস্টবাদ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলাম। এ সম্পর্কে বিস্তর পড়াশুনা শুরু করলাম। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে দেখতে পেলাম, খ্রিস্ট ধর্মে ক্যাথলিক, প্রোটেস্টান্টসহ নানা বিভক্তি। আমার বিস্ময় বেড়ে গেল যখন দেখলাম ধর্মমতে ব্যাপক বিভক্তি থাকলেও তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদে ঈমান না আনার বেলায় এরা সব একাট্টা।
শিক্ষা জীবন শেষে সাঁতার প্রশিক্ষক হিসেবে আমি সৌদি আরব গেলাম। এই প্রথম আমার মুসলিমদের সংস্পর্শে আসা। আগেই বলেছি ফিলিপাইনে থাকতে আমি কোনো মুসলিমের সঙ্গ পাইনি। ফিলিপাইনের মুসলিমরা তাদের অঞ্চলগুলোতেই সীমাবদ্ধ থাকেন। আমরা তাদের সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাই না। সরকারি প্রচার মাধ্যম যা প্রচার করে অগত্যা আমাদেরকে তা-ই বিশ্বাস করতে হয়। মিডিয়া দেশের জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করে, দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিমদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর যেসব সংঘর্ষ হয় তা রাজনৈতিক। এর সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা মুসলমানদের একটি উগ্রগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরে। যারা কেবল তাদের দেশকে দ্বিখণ্ডিত করতে চায়। পেতে চায় তাদের রাজনৈতিক অধিকার। আল্লাহর অসংখ্য শুকরিয়া যে, আজ আমি যাদের একজনে পরিণত হয়েছি সেই মুসলিম ভাইদের কারও দিকে কখনো অস্ত্র তাক করিনি।
আমি সৌদি আরবে যাওয়ার পরেই কেবল মুসলিম সম্পর্কে জানতে পারি। তাদের অবস্থা, আচার ও আকীদা (বিশ্বাস) সম্পর্কে অবহিত হই। আমি যাদের সাঁতার প্রশিক্ষণ দিতাম তাদের মধ্যে এক বালক ছিল। বয়স তার অনূর্ধ্ব তেরো। ক্ষুদে এই মুসলিমের চলাফেরা ও কাজকর্মে লক্ষ্য করতাম দারুণ এক নিয়মানুবর্তিতা। ওর স্বভাব শান্ত। জীবন যাপন সুশৃঙ্খল। আমাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির অন্যথা করে না সে কখনো। যথাসময়ে সালাত আদায়ে তার চেষ্টা দেখার মতো। অবসরের সিংহভাগ সময়ই কাটত তার নিবিষ্টমনে কুরআন তেলাওয়াতে।
মুসলিম বালকটির ছিল তীক্ষ্ন মেধা আর বিস্ময়কর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। আমি তার কর্মকাণ্ডের প্রতি লক্ষ্য করছি, তার সঙ্গ আমাকে আনন্দ দিচ্ছে- এতটুকু বুঝতে পেরেই সে আমার সামনে একগাদা ইংরেজিতে অনূদিত ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বই উপস্থাপন করল। ইংরেজি অনুবাদসহ কুরআন শরীফের একটি কপিও দিল। সঙ্গে সে এও বলল, ‘আপনি এসব পড়লেই আমার সুবিন্যস্ত জীবন যাপনের রহস্য উদ্ধার করতে পারবেন।’
এই প্রথম ইসলাম সম্পর্কে জানার অভিজ্ঞতা। যত পড়লাম আমার সামনে একে একে অজানা জগত উদ্ভাসিত হতে লাগল। আমি বা আমার মতো অন্য কেউ এ জগতের সন্ধান পাননি। এসব পড়ে আমি খুব প্রভাবিত হলাম। বিশেষ করে যখন কুরআন শরীফের তরজমা পড়লাম। এ কিতাবে যে একক স্রষ্টার কথা বলা হয়েছে, তা আমার চিন্তার সঙ্গে মিলে গেল। এ চিন্তায় আমি খুব তৃপ্তি ও স্বস্থি বোধ করলাম। এরপর আমি প্রবলভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলাম। এমনকি আমি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেয়ার আগেই নিজের নতুন নামও (আব্দুল করীম) ঠিক করে ফেললাম। আসলে ইসলামের সঙ্গে আমার এই পরিচয়ের জন্য আল্লাহর অনুগ্রহের পর এই বালকটির প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ। এই পরিচয়ের পরই শুরু হয় হেদায়েতের পথে আমার অভিযাত্রা।
আমি খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন দেখতে লাগলাম আমার সহকর্মীদের সময়মতো সালাত আদায়ের দৃশ্য। আমার কর্মক্ষেত্রেই ছিল মসজিদ। আমি পর্যবেক্ষণ করতাম তাদের সালাত। কী বিস্ময়কর তন্ময়তায় তারা নামাজে নিমগ্ন হত! সবাই একসঙ্গে রুকু করছে, সিজদা করছে! একই ইমামের পেছনে সবাই কত শৃঙ্খলা ও গুরুত্বের সঙ্গে নামাজ আদায় করছে!
আমার কর্মস্থলের বন্ধুরাও অনুদারতা দেখাননি। তারা আমাকে জেদ্দায় রাখা এই বালকটির মতই সহযোগিতা করেছেন। যথেষ্ট যত্ন-আত্তি করেছেন। তারা যখন আমার ইসলাম সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, ইসলাম নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা এবং নামাজের ব্যাপারে অনন্ত কৌতূহল লক্ষ্য করলেন, আমাকে ইসলাম সম্পর্কে কিছু কিতাব পড়তে দিলেন।
তাদের দেয়া গ্রন্থগুলোর মধ্যে ছিল পাদ্রীদের সঙ্গে আহমদ দিদাতের সংলাপের বই। আমি অনেক শুনেছি, মুসলমানরা অন্যদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করে। সৌদি আরবে আসার এগে থেকেই আমার মাথায় এই চিত্র আকাঁ ছিল। কিন্তু এখানে এসে আমি এ ধরনের কোনো আচরণ দেখলাম না। সিজওয়ার্টের সঙ্গে আহমদ দিদাতের বিতর্ক অনুষ্ঠানের বই আমার মনে অনেক গভীর প্রভাব সৃষ্টি করল। এই লোকটির ব্যাপারে আমি যার পর নাই বিস্মিত। কিভাবে তিনি একেরপর এক প্রমাণ উপস্থাপন করেন! একটির পিঠে আরেকটি যুক্তি তুলে ধরেন! বর্ণনা আর যুক্তি কোনোটির অভাব নেই তাতে! প্রতিটি আসর পাঠে আমি হেসে মরি আর সিজওয়ার্ট পরাজিত বিষণ্ন হতে থাকে। তার প্রতিক্রিয়া ছিল অতৃপ্ত মানুষের নির্ভুল প্রতিক্রিয়া। তার অবস্থান যে ভ্রান্তির পক্ষে, মুসলমানদের আগে তা খ্রিস্টানও বুঝতে পারছিল।
এক পর্যায়ে আমি আহমদ দিদাতের কাছে চিঠি লিখলাম। এতে আমি তার যুক্তির শাণিত অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অসাধারণ ক্ষমতার প্রশংসা করলাম। তার কাছে এ ধরনের অসত্য থেকে সত্য উন্মোচনকারী বিতর্ক ও সংলাপের বেশি বেশি বই চাইলাম।
এখন আমি খ্রিস্টান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হওয়ার প্রয়োজন বোধ করলাম। এতদুদ্দেশে আমার সহকর্মীদের কাছে এ জন্য আমার করণীয় কী তা জানতে চাইলাম। আর সেদিনই আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আমি ঈমান আনলাম আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর এবং শেষ দিবসের ওপর। বিশ্বাস স্থাপন করলাম জান্নাত ও জাহান্নাম সম্পর্কেও। সে এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। আমি নিজের অপরিমেয় সৌভাগ্য অনুভব করলাম। আজ অনুগত মুসলিম হিসেবে জীবন যাপন করি। আমি সালাত আদায়ে মসজিদে যাই। সেখানে সিজদাবনত হয়ে এক অপার্থিব তৃপ্তি ও সুখ বোধ করি। জীবন যাপনেও তেমনি অপূর্ব প্রশান্তির আস্বাদ পাই। আমার অতীত জীবন ছিল বিশৃঙ্খলা আর উদ্দেশ্যহীন হট্টগোলে পূর্ণ। আল্লাহ আমাকে সে অবস্থার বদলে আজ আলো, শৃঙ্খলা, সচ্চরিত্র ও মূল্যবোধের জীবন দান করেছেন। সত্যিই আমি মুসলিম ভাইদের সঙ্গ পেয়ে সৌভাগ্যবান। সন্দেহ নেই ইসলাম অনেক মহান ধর্ম। এর সঙ্গে জড়িয়ে ধন্য আমার জীবন।

হিজাব যেভাবে ইসলামের দিকে পথ দেখাল

অনুবাদক: আলী হাসান তৈয়ব
সম্পাদনা: আবদুল কাদের
আজ আমি এক মার্কিন অধ্যাপকের ইসলাম গ্রহণের গল্প তুলে ধরতে চাই। জানেন তার ইসলাম গ্রহণের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল কী? হ্যা, তার ইসলাম গ্রহণের প্রথম ও একমাত্র কারণ ছিল এক মার্কিন তরুণীর হিজাব। যিনি তার হিজাব নিয়ে সম্মান বোধ করেন। নিজ ধর্ম নিয়ে গর্ব করেন। শুধু একজন অধ্যাপকই ইসলাম গ্রহণ করেন নি। তার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের মধ্যে তিন ডক্টর ও চার ছাত্রীও ইসলাম ধর্মে অন্তর্ভুক্ত হন। এ সাতজন ব্যক্তিই অভিন্ন সেই হিজাবকে কেন্দ্র করেই ইসলামে দীক্ষিত হন। আপনাদের সামনে গল্পটি তুলে ধরায় আর বিলম্ব করতে চাই না। গল্পটি তবে সেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে নামধারী মার্কিন ডক্টরের ভাষ্যেই পড়ুন।
নিজের ইসলামে প্রবেশের গল্প শোনাতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ আকুয়া বলেন,
বছর চারেক আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সহসা এক বিতর্ক মাথা চারা দিয়ে ওঠে। এখানে পড়তে আসে এক মুসলিম তরুণী। নিয়মিত সে হিজাব পরিধান করে। ওর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন একজন কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী। যে কেউ তার সঙ্গে বিতর্ক এড়াতে চাইলেও তিনি গায়ে পড়ে তাকে চ্যালেঞ্জ করতেন। আর এমন অনুশীলনরত মুসলিম পেলে তো কথাই নেই। স্বভাবতই তিনি মেয়েটিকে যে কোনো সুযোগ পেলেই উত্যক্ত করতে লাগলেন।
এক পর্যায়ে মেয়েটির ওপর একের পর এক কল্পনাশ্রয়ী আক্রমণ করতে লাগলেন। মেয়েটি যখন শান্তভাবে এসবের মোকাবেলা করে যেতে লাগল, তার রাগ আরও বৃদ্ধি পেল। এবার তিনি অন্যভাবে মেয়েটিকে আক্রমণ করতে লাগলেন। তার এডুকেশন গ্রেড বৃদ্ধিতে অন্তরায় সৃষ্টি করলেন। তাকে কঠিন ও জটিল সব বিষয়ে গবেষণার দায়িত্ব দিলেন। কড়াকড়ি শুরু করে দিলেন তাকে নাম্বার দেয়ার ক্ষেত্রে। এরপরও যখন অহিংস পদ্ধতিতে মেয়েটিকে কোনো সমস্যায় ফেলতে পারলেন না, চ্যান্সেলরের কাছে গিয়ে তার বিরুদ্ধে বানোয়াট অভিযোগ দায়ের করলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল, ছাত্রী ও অধ্যাপক উভয়কে একটি বৈঠকে ডাকা হবে। উভয়ের বক্তব্য শোনা হবে। সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে মেয়েটির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের।
নির্দিষ্ট দিন এলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কমিটির সব সদস্য উপস্থিত হলেন। আমরা সবাই খুব আগ্রহ নিয়ে এ পর্বটির জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের মোকাদ্দমা এই প্রথম। বৈঠক শুরু হল। প্রথমে ছাত্রীটি অভিযোগ করল, অধ্যাপক সাহেব তার ধর্মকে সহ্য করতে পারেন না। এ জন্য তিনি তার শিক্ষার অধিকার হরণ করতে পর্যন্ত উদ্যোগী হয়েছেন। সে তার অভিযোগের সপক্ষে কয়েকটি দৃষ্টান্তও তুলে ধরল এবং এ ব্যাপারে তার সহপাঠীদের বক্তব্যও শোনার দাবি জানাল। সহপাঠীদের অনেকেই ছিল তার প্রতি অনুরক্ত। তারা তার পক্ষে সাক্ষী দিল। বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য দিতে ধর্মের ভিন্নতা তাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।
মেয়েটির জোরাল বক্তব্যের পর ডক্টর সাহেব আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যর্থ চেষ্টা করলেন। অব্যাহতভাবে কথাও বলে গেলেন; কিন্তু মেয়েটির ধর্মকে গালি দেয়ার সাহস সঞ্চয় করতে পারলেন না। অথচ মেয়েটি দিব্যি ইসলামের পক্ষে তার বক্তব্য উপস্থাপন করল। ইসলাম সম্পর্কে অনেক তথ্য ও সত্য তুলে ধরল। তার কথার মধ্যে ছিল আমাদের সম্মোহিত করার মত অলৌকিক শক্তি। আমরা তার সঙ্গে বাক্যবিনিময়ে প্রলুব্ধ না হয়ে পারলাম না। আমরা ইসলাম সম্পর্কে আপন জিজ্ঞাসাগুলো তুলে ধরতে লাগলাম আর সে তার সাবলীল জবাব দিয়ে যেতে লাগল। ডক্টর যখন দেখলেন আমরা অভিনিবেশসহ মেয়েটির যুক্তিতর্ক শুনছি, তার সঙ্গে আলাপচারিতায় মগ্ন হয়েছি, তখন তিনি হল থেকে নিরবে বেরিয়ে গেলেন। মেয়েটিকে আমাদের গুরুত্ব দেয়া এবং সাগ্রহে তার বক্তব্য শোনা দেখে তিনি কিছুটা মর্মাহত হলেন বৈকি। এক পর্যায়ে তিনি এবং তার মত যাদের কাছে মেয়েটির আলোচনা গুরুত্বহীন মনে হচ্ছিল তারা সবাই বিদায় নিলেন। রয়ে গেলাম আমরা- যারা তার কথার গুরুত্ব অনুধাবন করছিলাম। তার বাক্যমাধুর্যে অভিভূত হচ্ছিলাম। কথা শেষ করে মেয়েটি আমাদের মধ্যে এক টুকরো কাগজ বিতরণ করতে লাগল। ‘ইসলাম আমাকে কী বলে’ শিরোনামে সে তার চিরকুটে ইসলাম গ্রহণের কারণগুলো তুলে ধরেছে। আলোকপাত করেছে হিজাবের মাহাত্ম্য ও উপকারিতার ওপর। যে হিজাব নিয়ে এই সাতকাহন এর ব্যাপারে তার পবিত্র অনুভূতিও ব্যক্ত করেছে সেখানে।
বৈঠকটি অমিমাংসিতভাবেই সমাপ্ত হল। মেয়েটির অবস্থান ছিল অত্যন্ত বলিষ্ঠ। যে কোনো মূল্যে নিজের অধিকার রক্ষা করবে বলে সে প্রত্যয় ব্যক্ত করল। প্রয়োজনে আদালত পর্যন্ত যাবে সে। এমনকি তার পড়ালেখা পিছিয়ে গেলেও সে এ থেকে পিছপা হবে না। আমরা শিক্ষা কমিটির সদস্যরা কল্পনাও করি নি মেয়েটি তার ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যাপারে এমন অনমনীয় মনোভাবের পরিচয় দেবে। কতজনকেই তো এতগুলো শিক্ষকের সামনে এসে চুপসে যেতে দেখলাম। যা হোক, ঘটনার পর থেকে এ নিয়ে ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে বিতর্ক চলতে থাকল।
কিন্তু আমি কেন জানি নিজের ভেতর হিজাবের এই ধর্ম নিয়ে প্রবল আলোড়ন অনুভব করলাম। এ ব্যাপারে অনেকের সঙ্গেই কথা বললাম। তারা আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে অনুপ্রাণিত করল। কেউ কেউ উৎসাহ যোগাল ইসলামে দীক্ষিত হতে। এর ক’মাস বাদেই আমি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলাম। ক’দিন পর দু’জন অধ্যাপক আমাকে অনুসরণ করলেন। এবং সে বছরই আরও একজন ডক্টর ইসলাম গ্রহণ করলেন। আমাদের পথ ধরে চারজন ছাত্রও ইসলামে দাখিল হল। এভাবে অল্পকালের মধ্যেই আমরা একটি দল হয়ে গেলাম- আজ যাদের জীবনের মিশনই হলো, ইসলাম সম্পর্কে জানা এবং মানুষকে এর প্রতি আহ্বান জানানো। আলহামদুলিল্লাহ অনেকেই ইসলাম কবুলের ব্যাপারে সক্রিয় চিন্তা-ভাবনা করছেন। ইনশাআল্লাহ অচিরেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের ইসলাম গ্রহণের সুসংবাদ শুনতে পারবে। সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য।