শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ইসলাম গ্রহণের জন্য কোন বাধ্যবাধকতা নেই?


‘আমার কিছু বন্ধু আমাকে বলে যে, যদি কেউ ইসলামে প্রবেশ না করে, তাহলে সেটা নাকি তার স্বাধীনতা (choice) এবং তাকে মুসলিম হওয়ার জন্য জোর করা যাবে না, দলীল হিসেবে এই আয়াতটিকে উল্লেখ করে থাকে, যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলছেন,
-“আর তোমার পরওয়ারদেগার যদি চাইতেন, তবে পৃথিবীর বুকে যারা রয়েছে, তাদের সবাই ঈমান নিয়ে আসতে সমবেতভাবে। তুমি কি মানুষের উপর জবরদস্তী করবে ঈমান আনার জন্য?”  [ইউনুস ৯৯]
-“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।” [বাকারাহ ২৫৬]
এ বিষয়ে আপনার মতামত কি ?’
আলহামদুলিল্লাহ
আলেমগণ এই দুটি আয়াত এবং এই ধরণের আয়াতসমূহের অর্থ  ব্যাখা করে বলেছেন যে,  এগুলো তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে যাদের কাছ থেকে জিযিয়া কর নেয়া যেতে পারে, উদাহরণস্বরুপ- ইহুদী, খ্রিস্টান এবং জোরাস্ট্রিয়ান বা ম্যাজিয়ান অর্থাৎ পারস্যের অগ্নিউপাসক। তাদেরকে জোর করা হয় না, বরং তাদের ক্ষেত্রে হয়তো ইসলাম গ্রহণ কিংবা জিযিয়াহ প্রদান এই দুটি প্রস্তাব থেকে বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।
অন্যান্য আলেমগণ বলেছেন যে, এগুলো প্রয়োগ করা হয়েছিল একেবারে শুরুর দিকে, এরপর যুগপৎভাবে এগুলো রহিত হয়ে গেছে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আদেশ করেছেন লড়াই করার জন্য এবং জিহাদ ঘোষণা করার জন্য। কাজেই যে কেহ ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে যখন মুসলিমরা লড়াই করতে সক্ষম, যতক্ষণ না হয়তো তারা ইসলাম গ্রহণ করবে অথবা জিযিয়াহ প্রদান করবে যদি তারা সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত হয় যারা জিযিয়াহ প্রদান করতে পারে। সেই সকল কুফফারদেরকে অবশ্যই ইসলাম গ্রহণের জন্য বাধ্য করতে হবে যদি তারা সেই দলের হয়ে থাকে যাদের কাছ থেকে জিযিয়াহ নেয়ার অনুমতি নেই, কারণ এর মাধ্যমে (ইসলাম গ্রহণ) তারা সুখ ও মাগফেরাতের দিকে অগ্রসর হয়, দুনিয়া ও আখিরাতে। সত্যের সাথে সংযুক্ত থাকতে কোন ব্যক্তিকে  বাধ্য করা, যেখানে হেদায়াত ও সুখ আছে, এটা তার থেকে উত্তম যখন সে মিথ্যার সাথে সংযুক্ত থাকে। ঠিক যেভাবে, একজন ব্যক্তিকে বাধ্য করা যেতে পারে তার দায়িত্ব পালনের জন্য, যা করার জন্য যে অন্যদের কাছে ঋণী, বা দায়ী থাকে এমনকি সেটা যদি কারাবরণ, প্রহার করার মাধ্যমেও বাধ্য করা হয়ে থাকে। অনুরপভাবে, কাফিরদেরকে একমাত্র আল্লাহর উপর ঈমান নিয়ে আসার জন্য বল প্রয়োগ করা এবং দীন ইসলামে প্রবেশ করানো আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং আরও জরুরী। কারণ এর মাধ্যমে দুনিয়া এবং আখিরাতের সুখ শান্তির দিকে পথ দেখানো হয়। এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে না  যদি তারা আহলে কিতাব (ইহুদী, খ্রিস্টান, মাজুসী) হয়ে থাকে কেননা ইসলাম বলে এই তিন গ্রুপের লোকদেরকে সুযোগ দেয়া যেতে পারে, হয় তারা ইসলামে প্রবেশ করবে অথবা তারা জিযিয়া প্রদান করবে এবং নিজেদেরকে অবনমিত অনুভব করবে।
উলামাদের মধ্যে কেউ কেউ মত প্রকাশ করেছেন যে, বাকিদের ক্ষেত্রেও ইসলাম গ্রহণ কিংবা জিযিয়া প্রদান এই দুইটি সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে সঠিক মত হল, অন্যদের ক্ষেত্রে কোন সুযোগ দেয়া যাবে না, বরং এই তিন দলের লোকেরাই একমাত্র যাদেরকে সুযোগ প্রদান করা যেতে পারে, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরব উপদ্বীপের কুফফারদের সাথে লড়াই করেছিলেন এবং তাদের ক্ষেত্রে তিনি শুধুমাত্র মুসলিম হওয়াকেই গ্রহণ করেছিলেন। এবং আল্লাহ বলেন,
“কিন্তু যদি তারা তওবা করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [তাওবা ৫]
তিনি বলেননি, ‘যদি তারা জিযিয়া প্রদান করে’ ইহুদী, খ্রিস্টান এবং মাজুসীদেরকে ইসলামে প্রবেশ করার জন্য বলা হবে, যদি তারা অস্বীকার করে তখন তাদেরকে জিযিয়া প্রদানের জন্য বলা হবে, আর যদি তারা জিযিয়া প্রদানেও অস্বীকার করে তখন মুসলিমরা অবশ্যই তাদের সাথে যুদ্ধ করবে যদি তারা তা করতে সক্ষম হয়।
আল্লাহ বলেন, “তোমরা যুদ্ধ কর ঐ লোকদের সাথে, (১) যারা আল্লাহ ও (২) রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, (৩) আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং (৪) গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম (ইসলাম) আহলে-কিতাবের(ইহুদী,খ্রিস্টান) মধ্য থেকে, যতক্ষণ না করজোড়ে  তারা জিযিয়া প্রদান করে।” [তাওবা ২৯]
আর এটা প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেজিয়ান/অগ্নিপূজারী দের কাছ থেকে জিযিয়াহ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু এর বাইরে এই তিনটি গ্রুপের বাইরে অন্য কারও কাছ থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিযিয়াহ গহণ করেছিলেন বলে কোন প্রমাণ নেই।
আর এই বিষয়ের মূলনীতি হল আল্লাহর কালাম,
“আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ফিতনা(কুফর, শিরক, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ইবাদত করা) সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়; এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়(সারা দুনিয়াতে)” [আনফাল ৩৯]
“অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [তাওবা ৫]
এই আয়াতটি পরিচিত ‘আয়াত আল সাইফ (তরবারীর আয়াত)’ নামে।
এই সকল আয়াত এবং অনুরূপ আয়াতসমূহের মাধ্যমে সেই সকল আয়াতগুলো রহিত হয়ে গেছে যেখানে বলা হয়েছে যে, মুসলিম হওয়ার জন্য কোন বাধ্যবাধকতা নেই।
আর আল্লাহই হলেন সকল শক্তির উৎস।
মাজমু ফাতওয়া আল মাক্বালাত লিল শাইখ ইবন বাজ, ৬/১২৯

0 মন্তব্য(গুলি):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন